কাউখালীতে মাদকবিরোধী অভিযানের ঝড়, বড় সরবরাহকারীদের নিয়ে প্রশ্ন!

মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলায় জোরদার হয়েছে মাদকবিরোধী অভিযান। গত জুন থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসা একাধিক অভিযানের তথ্যে দেখা যায়, ইয়াবা ও গাঁজাসহ একের পর এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে কাউখালী থানা পুলিশ। উদ্ধার হয়েছে ইয়াবা, গাঁজা ও গাঁজাগাছ।
তবে এসব অভিযানের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—মাদকের খুচরা পর্যায়ের বিক্রেতা ও সেবনকারীরা ধরা পড়লেও মাদক সরবরাহের মূল উৎস এবং বড় কারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান কতটা হচ্ছে?
প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত দুই মাসে কাউখালীতে অন্তত ১২৫ পিস ইয়াবা, ৪৭৫ গ্রাম গাঁজা এবং তিনটি গাঁজাগাছ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময় অন্তত ১৮ জনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে এটি পুলিশের আনুষ্ঠানিক বা পূর্ণাঙ্গ দুই মাসের পরিসংখ্যান নয়; বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদে পাওয়া তথ্যের সমষ্টি।
গত ২২ জুন রাতে কাউখালী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বাসভবন থেকে ৩০ পিস ইয়াবা ও মাদক সেবনের সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে একজন দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়।
এ ঘটনার পরদিনই বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ জুনের শুরুতেই নয়, মাসের শেষভাগে এসে কাউখালীতে মাদকবিরোধী অভিযানের দৃশ্যমান তৎপরতা বাড়তে দেখা যায়।
এরপর ২৬ জুন দিবাগত রাতে উপজেলার সদর ইউনিয়নের চিরাপাড়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৯৫ পিস ইয়াবাসহ চারজনকে আটক করে পুলিশ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাদের বয়স ও পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ৩০ ও ৯৫ পিস—দুই অভিযানে মোট ১২৫ পিস ইয়াবা উদ্ধারের তথ্য পাওয়া যায়।
ইয়াবার পাশাপাশি কাউখালীতে গাঁজার বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে শিয়ালকাঠী এলাকায় গাঁজাগাছ উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। একটি অভিযানে প্রায় পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি উচ্চতার একটি গাঁজাগাছ উদ্ধারের কথা জানানো হয়।
এরপর পৃথক অভিযানে গাঁজাসহ আরও কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়। ১২ জুলাই শিয়ালকাঠী এলাকায় পৃথক অভিযানে মোট ২৫ গ্রাম গাঁজা উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
অর্থাৎ, মাদকবিরোধী অভিযানের আওতা শুধু ইয়াবায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; গাঁজা উৎপাদন ও সংরক্ষণের বিরুদ্ধেও নজরদারি রয়েছে।
সর্বশেষ আগস্টের শুরুতে কাউখালীতে বাড়ির ভেতর গাঁজাগাছ উদ্ধারের খবর সামনে আসে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে দুটি গাঁজাগাছসহ একজনকে আটক করা হয়।
এ ধরনের ঘটনা মাদকদ্রব্যের সরবরাহ ও ব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ, স্থানীয় পর্যায়ে গাঁজার উপস্থিতি শুধু বাইরে থেকে আসা মাদকের ওপর নির্ভরশীল কি না, নাকি কোথাও কোথাও স্থানীয়ভাবে চাষও হচ্ছে—সেটিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আনার বিষয়।
কাউখালীতে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে মাদকসেবী, খুচরা পর্যায়ের কারবারি কিংবা মাদক বহনকারীদের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু মাদকের মূল সরবরাহকারী, পাইকারি বিক্রেতা কিংবা এর পেছনের অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রকাশ্যে বিস্তারিত তথ্য খুব একটা পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে ‘বড় কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো পুলিশের কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি এখন পর্যন্ত জনমনে থাকা প্রশ্ন হিসেবেই দেখা উচিত।
আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্টদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু মাদকসহ ব্যক্তিকে আটক করাই যথেষ্ট নয়। মাদকের উৎস, সরবরাহের রুট, অর্থের লেনদেন এবং এর সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের শনাক্ত করাও জরুরি।
কাউখালীতে গত দুই মাসের প্রকাশিত ঘটনাগুলো বলছে, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান থেমে নেই। ইয়াবা থেকে গাঁজা—বিভিন্ন ধরনের মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হচ্ছে। একাধিক মামলাও হয়েছে, আসামিদের আদালতে পাঠানোর তথ্যও পাওয়া গেছে। এমনকি এক পিস ইয়াবাসহ আটক একজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তিন মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে মাদক নির্মূলে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য আনতে হলে অভিযানের পরিধি আরও বিস্তৃত করার দাবি উঠছে। বিশেষ করে মাদক সরবরাহের উৎস, বড় কারবারি ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করা, মাদকসেবীদের পুনর্বাসন এবং তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো—সবগুলো বিষয়কে একই সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ, একজন মাদকসেবীকে আটক করলে একজন কমে; কিন্তু মাদকের সরবরাহব্যবস্থা অক্ষত থাকলে নতুন সেবনকারী তৈরি হতে সময় লাগে না।
তাই কাউখালীর সাম্প্রতিক অভিযান নিয়ে এখন স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা একটাই—ছোট কারবারি ও সেবনকারীদের পাশাপাশি মাদকের মূল উৎস এবং বড় সরবরাহকারীদেরও আইনের আওতায় আনা হোক।।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

খুলনায় স্বাস্থ্য কর্মসূচি পর্যালোচনা: জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকার শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ

অদ্য ২৬/০৮/২০২৬ রোজ বধবার সকাল ১০ ঘটিকা হতে খুলনা বিভাগে এইচপিভি টিকা এবং ইপিআই কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যালোচনা ও বাস্তবায়নের কৌশল নির্ধারণে অনুষ্ঠিত হয়েছে বিভাগীয় কর্মশালা, যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শতভাগ কাভারেজ নিশ্চিত করার নির্দ.. খুলনা হোটেল সিটি ইনে আয়োজিত দিনব্যাপী এই পর্যালোচনা কর্মশালায় খুলনা বিভাগের স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ কর্মপদ্ধতি নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের উপস্থিতিতে আয়োজিত এই সভায় প্রধানত জরায়ুমুখ ক্যান্সার প্রতিরোধে কিশোরীদের জন্য নির্ধারিত এইচপিভি টিকার সফল বাস্তবায়ন এবং ইপিআই কর্মসূচির পরিধি বিস্তারের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১০ বছর বয়সী সকল কিশোরীকে এই টিকার আওতায় নিয়ে আসার যে জাতীয় চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তা কীভাবে খুলনা বিভাগের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় শতভাগ সফল করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী দশ জেলার সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এবং শিক্ষা বিভাগের প্রতিনিধিরা তাদের নিজ নিজ এলাকার কার্যক্রমের চিত্র তুলে ধরেন, যা মূলত স্বাস্থ্যসেবার তৃণমূল পর্যায়ের সক্ষমতা ও বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলোকে সামনে নিয়ে এসেছে। কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের চ্যালেঞ্জ এবং ভুক্তভোগী ও লক্ষ্যভুক্ত জনগোষ্ঠীর সচেতনতার অভাবকে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা জানিয়েছেন যে, এইচপিভি টিকা নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার ও তথ্যের ঘাটতি দূর করা না গেলে শতভাগ কাভারেজ অর্জন করা কঠিন। এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, শুধুমাত্র স্বাস্থ্য বিভাগের একক প্রচেষ্টায় এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সফল হওয়া সম্ভব নয়। তিনি মিডিয়ার ভূমিকা এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ইমামদের মাধ্যমে মসজিদের মুসল্লিদের অবহিত করলে টিকার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতার অভাব বা গাফিলতি জনস্বাস্থ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে, তাই প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীকে আরও বেশি জবাবদিহিতার আওতায় আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।