সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার লামাগ্রাম হাওরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী ৪৫টি পরিবারকে বসতভিটা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা, হুমকি ও হয়রানির অভিযোগে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী। শুক্রবার বিকেলে লামাগ্রাম হাওর গ্রামের মসজিদসংলগ্ন সড়কে আয়োজিত এ মানববন্ধনে তাঁরা নিজেদের বসতভিটার নিরাপত্তা, স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা এবং অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রতিকার দাবি করেন।
মানববন্ধনে অভিযুক্ত হিসেবে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার কামালবস্তি গ্রামের আব্দুল আজিজ রাজা, লামাগ্রাম নয়াবস্তি গ্রামের এমাদ উদ্দিন সেলিম এবং গোয়াইনঘাট উপজেলার হাদারপার গ্রামের আব্দুর রহিমসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে স্থানীয় বাসিন্দাদের হয়রানি, জমি চাষে বাধা, মাছ ধরতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি এবং উচ্ছেদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্তদের মধ্যে একজনের বক্তব্য পাওয়া গেলেও অন্যান্যদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মানববন্ধনে লামাগ্রাম হাওরের বাসিন্দা হারিছ মিয়া বলেন, “জন্মের পর থেকে বাপ-দাদার ভিটায় বসবাস করছি। এখন অভিযুক্তরা আমাদের উচ্ছেদের চেষ্টা করছে এবং হুমকি দিচ্ছে। গত তিন মাসে আমাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা করা হয়েছে। এর একটিতে ছয়জন এবং অন্যটিতে ১২ জনকে আসামি করা হয়েছে। আমাদের জমি চাষ করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে, মাছ ধরতে দেওয়া হচ্ছে না। ক্ষেত-খামার লুটপাটেরও চেষ্টা চলছে। চলাফেরা করতে গিয়ে আমরা আতঙ্কে থাকি।”
একই গ্রামের বাসিন্দা মনির উদ্দিন বলেন, “আমরা প্রায় ৬৩ বছর ধরে এখানে বসবাস করছি। এলাকায় ৪৫টি বাড়ি, মসজিদ, কবরস্থান, সরকারি রাস্তা ও বিদ্যুৎ সংযোগ রয়েছে। এরপরও আমাদের বিরুদ্ধে ভুয়া দলিল তৈরি করে হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এ বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
ভুক্তভোগী সাহাব উদ্দিন অভিযোগ করেন, জাল দলিলের মাধ্যমে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। তিনি বলেন, “এখানে বাঁধাডর নামে একটি বিল রয়েছে, যা সরকার প্রতিবছর প্রায় ৫০ লাখ টাকায় ইজারা দেয় বলে আমরা জানি। সেই বিলেও আমাদের বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে। আমরা নিরীহ মানুষ। এই হয়রানি থেকে মুক্তি চাই।”
মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রমজান আলী বলেন, একটি চক্র দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকার জমি দখলের চেষ্টা করছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন জায়গায় জালিয়াতিপূর্ণ দলিলের অভিযোগ রয়েছে। আমি সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর প্রতি আহ্বান জানাই, তিনি যেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে নিরীহ মানুষের পাশে দাঁড়ান।”
স্থানীয় ইউপি সদস্য তরিক উল্লাহ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বসতবাড়ি থাকা সত্ত্বেও দরিদ্র মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ পেয়েছেন। এ পরিস্থিতি থেকে তাঁদের মুক্তি দিতে তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুস্তাকিম আহমদ ফরহাদ বলেন, “মানবতার পক্ষে দাঁড়াতেই এখানে এসেছি। কিছু লোক ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে গরিব মানুষকে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। জমিটি খাস হলে এর মালিক সরকার; কোনো ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে এর মালিকানা দাবি করতে পারেন না। আর ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি হলে সেটির মালিকানা আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া উচিত। এখানকার মানুষ কৃষিনির্ভর ও খেটে-খাওয়া। তাঁদের হয়রানিমুক্ত করতে সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।”
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আব্দুল আজিজ রাজা বলেন, “আমি কারও জায়গা জবরদখল করছি না। এটি খাস জমি নয়। আমি একজনের কাছ থেকে মালিকানাধীন জমি কিনেছি। আমি বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ায় আছি।”
ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিনের বসতভিটা ও জীবিকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জমির প্রকৃত মালিকানা যাচাই, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং চলমান বিরোধের আইনসম্মত নিষ্পত্তি জরুরি। তাঁরা এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সরকারের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।


