চার দশক ধরে চীনের উত্থান গড়ে উঠেছিল বিশ্বের সাথে এক অসাধারণ বোঝাপড়ার ওপর। চীন সরবরাহ করেছিল শ্রম, বিশাল পরিসর এবং পরবর্তীতে এক অতুলনীয় গভীর শিল্প প্রতিবেশ (ecosystem)। আর বিশ্ব সরবরাহ করেছিল প্রযুক্তি, মূলধন ও বাজার। চীন সমৃদ্ধশালী হয়েছিল। বিশ্বের বাকি অংশ পেয়েছিল সস্তা এবং ক্রমশ উন্নত মানের পণ্য। চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এসে সেই বোঝাপড়াকে বদলাতেই হবে। চীনের উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে বলে নয়, বরং এটি অতিরিক্ত সফল হয়ে ওঠার কারণে।
গত কয়েক বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক ও রফতানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো “চীন প্লাস ওয়ান” কৌশল গ্রহণ করেছে। সরবরাহ শৃঙ্খলের (supply chain) স্থিতিস্থাপকতা এখন পরিচালনা পর্ষদের প্রধান ভাবনায় পরিণত হয়েছে। তা সত্ত্বেও চীনের রফতানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে, যা তার দুর্বল হয়ে পড়া অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে রক্ষা করতে সাহায্য করছে। ২০২৫ সালে পণ্য বাণিজ্যে দেশটির উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তবে এটি চিরকাল চলতে থাকবে বলে মনে করাটা ভুল হবে। ক্রমশ যা অর্থনৈতিকভাবে দক্ষ, তা আর রাজনৈতিকভাবে টেকসই থাকছে না।
উৎপাদন খাতে চীনের একক আধিপত্য বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এবং তা কেবল আমেরিকাতেই নয়। ইউরোপ তার শিল্প ভিত্তি ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চিন্তায় উদ্বিগ্ন। উন্নয়নশীল দেশগুলো চীনের বিনিয়োগকে স্বাগত জানায় এবং চীনের উন্নয়নের অভিজ্ঞতাকে শ্রদ্ধা করে, তবে তারা একটি যৌক্তিক প্রশ্নও তুলে ধরে: এই মডেলে আমাদের উন্নয়ন কোথায়?
অধিকাংশ দেশ কেবল চীনের তৈরি বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV), ব্যাটারি, সৌর প্যানেল, যন্ত্রপাতি ও রোবট কিনতে চায় না। তারা নিজেদের কারখানা চায়। তারা চায় তাদের শ্রমিকরা নতুন দক্ষতা অর্জন করুক এবং তাদের সরবরাহকারীরা মান শৃঙ্খলে (value chain) ওপরের দিকে উঠুক। তারা প্রযুক্তি ও প্রায়োগিক জ্ঞান (know-how) চায়। বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলো অভিযোগ করে এসেছে যে চীনের বিশাল বাজারে প্রবেশের বিনিময়ে তাদের প্রযুক্তি হস্তান্তরের দাবি পূরণ করতে হতো। এখন চীন নিজেই টেবিলের অপর পাশে অবস্থান করছে এবং তাকে নিজের দক্ষতা ভাগ করে নেওয়ার অনুরোধ করা হচ্ছে।
চীন চিরকাল অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্বের উৎপাদক হয়ে থাকতে পারে না। আগামী কয়েক দশকে চীনের বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হবে সংরক্ষণবাদ এবং জাতীয় নিরাপত্তার দ্বারা ক্রমশ প্রভাবিত হতে যাওয়া বিশ্ব অর্থনীতির সাথে গভীরভাবে যুক্ত থাকা। এর সমাধান থাকতে পারে একটি নতুন ভূমিকায়: বিশ্বের কারখানা থেকে শিল্প ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতার রফতানিকারকে রূপান্তর।
চীনের নতুন মডেল
চীনের প্রকৃত সুবিধা এখন আর সস্তা শ্রম বা ভর্তুকিতে নয়, বরং বিশ্ব এ যাবৎকালের সবচেয়ে ঘন শিল্প প্রতিবেশ থেকে অর্জিত ও সঞ্চিত জ্ঞানের মধ্যে নিহিত। চীন এখন যা রফতানি করতে পারে তা কেবল তার তৈরি পণ্য নয়, বরং পণ্য কীভাবে তৈরি করতে হয় সে সম্পর্কে অর্জিত জ্ঞান।
চীন স্মার্টফোনকে কেন্দ্র করে যে শিল্প প্রতিবেশ গড়ে তুলেছিল, তা ব্যাটারি, সেন্সর, নির্ভুল উৎপাদন এবং পাওয়ার ইলেকট্রনিক্সে বিশেষ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। পরবর্তীতে সেই সক্ষমতা স্থানান্তরিত হয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়িতে। আর বৈদ্যুতিক গাড়ি ব্যাটারি, চিপ এবং অটোমেশনের ক্ষেত্রকে আরও এগিয়ে নিয়েছে। অটোমেশন গতি দিয়েছে রোবোটিক্সকে। শিল্পকলা, সরবরাহকারী, প্রকৌশলী এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আদান-প্রদানের মাধ্যমে জ্ঞান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি শিল্প এমন সক্ষমতা তৈরি করে যা পরবর্তী শিল্প গঠনের কাজকে আরও সহজ করে দেয়। এটিই চীনের উদ্ভাবনী চাকা (innovation flywheel)।
এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো সেই অর্জিত জ্ঞান অন্যত্র স্থানান্তরিত হতে পারে কি না। ব্রাজিল বা ইন্দোনেশিয়া কেউই কেবল একটি আদেশের মাধ্যমে শেনজেন শহরকে নতুন করে পুনর্নির্মাণ করতে পারবে না। তবে চীন এটি তৈরিতে যে ৩০ বছর সময় ব্যয় করেছে, তাদের সেই একই পথ ধরে হাঁটার প্রয়োজন নেই। চীন যা ইতোমধ্যে শিখেছে, তারা সেটিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সাথে যন্ত্রপাতি, প্রকৌশলী, উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দক্ষতা নিয়ে আসতে পারে। এর ফলে স্থানীয় শ্রমিকরা শেখে; স্থানীয় সরবরাহকারীদের উন্নতি হয়।
যে জ্ঞান সঞ্চয় করতে চীনের কয়েক দশক লেগেছিল, তা এভাবে অন্য অঞ্চলের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এটি হবে বিশ্বায়নে চীনের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মডেল: কেবল চীনের শিল্প প্রতিবেশের পণ্য রফতানি করা নয়, বরং সেই প্রতিবেশে নিহিত জ্ঞানের সুযোগ অন্য দেশগুলোকে দেওয়া।
এমন একটি পরিবর্তন ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ব্রাজিলে বিওয়াইডি (BYD) গাড়ি আমদানির বদলে স্থানীয়ভাবে তা উৎপাদন করছে এবং স্থানীয় সরবরাহকারী গড়ে তুলছে। হাঙ্গেরিতে তারা ইউরোপের প্রথম যাত্রীবাহী গাড়ির কারখানার পাশাপাশি একটি গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তুলছে, যা হাঙ্গেরীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে কাজ করবে।
ইন্দোনেশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ নিকেল প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে শুরু করে ব্যাটারি উৎপাদন ও পুনর্ব্যবহার (recycling) পর্যন্ত বিস্তৃত একটি সমন্বিত ব্যাটারি শিল্প তৈরিতে সাহায্য করছে। এই প্রাথমিক উদাহরণগুলো বিশ্বের সাথে একটি ভিন্ন সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়: যা চীন কী তৈরি করে তা রফতানির ওপর কম নির্ভরশীল, বরং তা তৈরির সক্ষমতা রফতানির ওপর বেশি নির্ভরশীল।
প্রথম দর্শনে এটিকে চীনের জন্য একটি ক্ষতি বলে মনে হতে পারে। দেশে উৎপাদন কেন ছেড়ে দেওয়া হবে? আগামীকালের প্রতিযোগীদের কেন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে? কারণ এর বিকল্প পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। দেশগুলো ক্রমশ আরও বিকল্প চায়। তারা চায় না যে তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ একক কোনো সরবরাহকারীর ওপর—চাই সে চীনা হোক বা আমেরিকান—অত্যধিক নির্ভরশীল থাকুক।
নির্ভরশীলতা যত বেশি হবে, তা ভেঙে ফেলার রাজনৈতিক চাপও তত বৃদ্ধি পাবে। একই যুক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। এআই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার প্রতিযোগিতাকে সাধারণত একটি দৌড় হিসেবে বর্ণনা করা হয়: কার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী চিপ, সবচেয়ে বেশি কম্পিউটিং পাওয়ার এবং সেরা প্রনতি মডেল (frontier models) রয়েছে? তবে অন্য আরেকটি প্রতিযোগিতা সমপরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে: কার এআই সবচেয়ে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে?
প্রযুক্তিগত চূড়ান্ত সীমানায় আমেরিকা এখনো অসাধারণ সুবিধা বজায় রেখেছে। চীনের সীমাবদ্ধতাগুলো তার প্রতিবেশকে কিছুটা ভিন্ন দিকে পরিচালিত করেছে: যেমন দক্ষতা, কম খরচে প্রয়োগ, উন্মুক্ত মডেল এবং দ্রুততম ব্যবহারিক প্রয়োগ। চীনা ডেভেলপারদের কাছে তাদের মডেলগুলো ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার, অন্যদের তা ব্যবহারের উপযোগী করার এবং তা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রতিবেশ থেকে মান বা সুবিধা অর্জনের জোরালো তাগিদ রয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হওয়া উন্মুক্ত এআই মডেলের সিরিজটি চীনা: আলিবাবার ‘কিয়েন’ (Qwen)।
চীন থেকে, ভালোবাসা সহ
যে প্রযুক্তিগুলো অর্থনীতিকে বদলে দেয়, সেগুলো সবসময় সবচেয়ে বেশি উন্নত প্রযুক্তি নাও হতে পারে। প্রযুক্তিগত সীমানার কাছাকাছি থাকার মতোই সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা এবং ব্যবহারের তীব্রতা গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বেশিরভাগ অংশের জন্য যে এআই-টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে, তা হয়তো এযাবৎকালের তৈরি সবচেয়ে বুদ্ধিমান মডেলটি নয়। বরং এটি এমন একটি মডেল হতে পারে যা পর্যাপ্ত সস্তা, যথেষ্ট উন্মুক্ত এবং সর্বত্র ব্যবহারের উপযোগী।
উন্মুক্ততা কেবল কোনো উদারতার কাজ নয়। এটি একটি অর্থনৈতিক কৌশলও হতে পারে। উন্মুক্ত ব্যবস্থা মূল কেন্দ্র থেকে কিছু রয়্যালটি ত্যাগ করে, কিন্তু প্রয়োগ, সমন্বয় ও সেবার জন্য বড় বাজার তৈরি করে। চীন যদি প্রযুক্তিগত সীমানাকে একচেটিয়া করতে না পারে, তবে তারা প্রযুক্তিকে আরও সস্তা, আরও মানানসই এবং আরও সর্বব্যাপী করে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
প্রযুক্তিগত প্রসার কী অর্জন করতে পারে, চীন নিজেই তার সবচেয়ে বড় আধুনিক নিদর্শন। ১৯৮০-র দশকে অর্থনীতি সংস্কার ও উন্মুক্ত করার পর, বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো মূলধন, উৎপাদন পদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ও প্রযুক্তি নিয়ে এসেছিল। চীনা শ্রমিক ও প্রকৌশলীরা তাদের কাছ থেকে শিখেছিলেন। দেশীয় সরবরাহকারী তৈরি হয়েছিল। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি প্রযুক্তিকে নিজেদের মতো উপযোগী করে নিয়েছিল এবং অবশেষে নিজেরাই উদ্ভাবক হয়ে উঠেছিল।
চীন এখন সেই উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অপর প্রান্তে পৌঁছেছে। ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের অর্থনৈতিক সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি এটি হবে না যে তারা বিশ্বের বাকি অংশে কতটুকু বিক্রি করে, কিংবা বিশ্ব উৎপাদনের কতটুকু অংশ চীনা সরবরাহ শৃঙ্খলে রয়ে গেছে, অথবা কোনো চীনা মডেল প্রতিটি এআই বেঞ্চমার্কে শীর্ষে রয়েছে কি না। বরং মাপকাঠি হবে এটিই যে, চীনের সাফল্য অন্যান্য দেশের জন্য সাফল্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারছে কি না।
গত জুলাইয়ে সাংহাইয়ে দেওয়া এক বক্তৃতায় শি জিনপিং যুক্তি দিয়েছিলেন যে, এআই প্রযুক্তিগুলো “ভাগ করে নেওয়া” উচিত যাতে দেশগুলো আরও ন্যায্যভাবে এর সুফল পেতে পারে। তিনি গ্লোবাল সাউথে এআই সক্ষমতা গড়ে তোলার জন্য বৃহত্তর প্রচেষ্টার আহ্বান জানান। এই চিন্তাটি সঠিক। আধিপত্য প্রতিরোধ সৃষ্টি করে। অন্যদিকে প্রসার অন্যদের যুক্ত থাকার কারণ যোগায়। চার দশক ধরে চীন এমন একটি বিশ্ব থেকে ব্যাপকভাবে উপকৃত হয়েছে যা মূলধন, প্রযুক্তি, জ্ঞান ও বাজার ভাগ করে নিতে প্রস্তুত ছিল।
আগামী কয়েক দশকের প্রশ্ন হলো, চীন অন্যদের জন্য একই কাজ করতে পারবে কি না।
তথ্যসূত্র: টাইম ম্যাগাজিন




