ট্রাম্প কি ভারতের কৌশলগত অবস্থান থেকে কঠিন শিক্ষা পেলেন? তিনি কি তা স্বীকার করবেন?

ভ্লাদিমির পুতিনের ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থসংস্থান বন্ধের অজুহাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রায় এক বছর ধরে ভারতকে রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে চাপ দিয়ে আসছিলেন। এমনকি এই ক্রয় অব্যাহত রাখার কারণে নয়া দিল্লিকে শাস্তি দিতে তিনি গত বছর ভারতীয় পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়া এবং আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসার মুখে ট্রাম্প নিজেই আন্তর্জাতিক বাজারে রুশ ডিজেল আনার একটি চুক্তিতে সই করেছেন।

এই নীতি পরিবর্তন একটি অপ্রিয় সত্য উন্মোচিত করেছে—যখন নিজ দেশের ভোটারদের ওপর জ্বালানি খরচের প্রভাব ট্রাম্পের সামনে হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তখন ভূরাজনৈতিক নীতিগুলো সমঝোতার যোগ্য হয়ে ওঠে। প্রশ্ন হলো—ট্রাম্প কি এখন ভারতের সেই যুক্তিকে স্বীকার করে নেবেন, যেখানে বলা হয়েছিল যে পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্যের কাছে সাশ্রয়ী জ্বালানি এবং সাধারণ মানুষের স্বার্থকে সহজে বিসর্জন দেওয়া যায় না?

মার্কিন ভোক্তাদের স্বার্থই সবার আগে

পুতিনের সঙ্গে সফল আলোচনার কথা উল্লেখ করে ৯ অক্টোবর ট্রাম্প এই চুক্তির ঘোষণা দেন। চুক্তি অনুযায়ী, রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে, যার পর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং পরবর্তীতে ১০ লাখ টন সরবরাহ করা হবে। পরিশোধনাগারের সক্ষমতা অনুযায়ী পরবর্তীতে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল আসতে পারে।

ডিজেল মার্কিন কৃষি, পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা (ট্র্যাকিং) এবং হিটিং সেক্টরের একাংশ সচল রাখে। ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি ভাড়া, খাদ্যপণ্য ও মুদ্রাস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা রিপাবলিকান দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না তা নির্ধারণকারী ভোটের আগে অত্যন্ত রাজনৈতিক সংবেদনশীল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কৃষক, খামারি ও ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানোকে ট্রাম্প তাঁর অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এখানে পরোক্ষ ব্যঙ্গাত্মক বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। যে প্রশাসন একসময় যুক্তি দিয়েছিল যে রাশিয়ার তেল ক্রয় মস্কোর যুদ্ধ তহবিলে সহায়তা করে, তারাই এখন মার্কিন নাগরিকদের জন্য রুশ জ্বালানি নিশ্চিত করতে বিধিনিষেধ শিথিল করতে প্রস্তুত। এই অর্থনৈতিক যুক্তি ভারতের কাছে সুপরিচিত, কারণ তারা অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি করে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দরপতন থেকে নিজ দেশের ভোক্তাদের বিচ্ছিন্ন রাখতে পারে না।

নয়া দিল্লির যুক্তি কখনো ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণকে সমর্থন করার জন্য ছিল না; বরং শত শত কোটি মানুষের জ্বালানি নিরাপত্তা, মুদ্রাস্ফীতি এবং ক্রয়ক্ষমতার মতো বিষয়গুলোই জ্বালানি ক্রয়ের সিদ্ধান্তে গুরুত্ব পাওয়া উচিত—এটাই ছিল তাদের অবস্থান। জনমত জরিপে জনপ্রিয়তা হ্রাস পাওয়া এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে ডিজেলের চড়া দাম হুমকি হয়ে দাঁড়ানোর পর ট্রাম্প হয়তো ভারতের এই অবস্থানটি কঠিন অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই শিখতে পারলেন।

যে ছাড় কাঙ্ক্ষিত ফল নাও দিতে পারে

তবে কোনো চুক্তির ঘোষণা দেওয়া এবং পাম্পে জ্বালানির দাম কমে যাওয়ার মধ্যে একটি বড় ফারাক রয়েছে। বিশ্লেষকদের সন্দেহ, রাশিয়ার শোধনাগার অবকাঠামোয় ক্ষতি এবং ডিজেল রপ্তানিতে নিজস্ব বিধিনিষেধের কারণে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সরবরাহের পরিমাণ পূরণ করা দেশটির জন্য সহজ হবে না। ইউক্রেনীয় হামলায় রুশ রপ্তানি সক্ষমতা ব্যাহত হয়েছে, আবার মস্কো নিজস্ব অভ্যন্তরীণ সরবরাহ রক্ষায় রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছিল।

প্রস্তাবিত এই সরবরাহ মার্কিন বাজারে ডিজেলের দামে বড় কোনো পরিবর্তন আনবে বলে মনে হয় না। জ্বালানি পরিবহনে সময় লাগে এবং বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় এই পরিমাণ অত্যন্ত কম। এই ব্যবস্থা হয়তো কিছুটা অতিরিক্ত সরবরাহ দেবে, তবে জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহনে সৃষ্ট ব্যাঘাতের ক্ষতি এটি দ্রুত পুষিয়ে দিতে পারবে না।

এতে রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা দৃশ্যত পুতিনকেই লাভবান করছে। মার্কিন ভোক্তারা যদি সামান্য সুবিধাও না পায়, তবে এর ফলে সৃষ্টি হওয়া কূটনৈতিক ও আইনি অসন্তোষ যেকোনো স্বল্পমেয়াদী মূল্যসুবিধার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।

আইনি লড়াই ভারতের অবস্থান জটিল করতে পারে

ভূরাজনীতির চেয়ে যে জনস্বার্থ অগ্রাধিকার পায় তা উপলব্ধি করার পর, ট্রাম্প কি তেল ইস্যুতে ভারতের দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে এখন স্বীকৃতি দেবেন? ভারতের প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ছাড়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হতে পারে ট্রাম্পের নিজের দেশের কংগ্রেস।

১১ অক্টোবর, রিপাবলিকান সুসান কলিন্স, লিসা মারকফস্কি, থম টিলিস ও জন কার্টিস এবং ডেমোক্র্যাট জিন শাহিন, রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও রন ওয়াইডেনসহ সাতজন সেনেটর এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। তারা যুক্তি দেন যে, ২০২২ সালে রুশ জ্বালানি আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞার মূল উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন অর্থ যাতে পুতিনের যুদ্ধ তহবিলে না যায় তা নিশ্চিত করা। তারা প্রশাসনের বিরুদ্ধে কংগ্রেসে পরামর্শ না করার এবং আইনগত ব্যাখ্যা না দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।

টিলিস আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেন, ট্রাম্প আইন অনুসরণ করছেন না বলে যৌক্তিক অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক আলাদাভাবে জানান যে, তিনি রুশ তেল ক্রয় বন্ধে হাউসে ভোটাভুটির আয়োজন করবেন। ট্রাম্পের জন্য এই বিরোধিতা বিশেষ অস্বস্তিকর, কারণ সেপ্টেম্বরে পাশ হওয়া ‘লিন্ডসি গ্রাহাম’ সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা আইনে রুশ জ্বালানির বড় ক্রেতাদের ওপর ১০০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপের বিধান রয়েছে।

তবে ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জোর দিয়ে বলেছেন যে, প্রশাসনের এটি করার জন্য পর্যাপ্ত আইনি এখতিয়ার রয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ট্যাংকারে লোড করা হয়েছে এমন রুশ ডিজেল রপ্তানির ওপর ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ২০২৭ সালের ৭ এপ্রিল পর্যন্ত সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে। কিন্তু সেই ছাড় কংগ্রেসের পর্যালোচনায় টিকে থাকবে কি না, তা প্রশাসনের যুক্তির চেয়ে ভিন্ন প্রশ্ন।

যদি ওয়াশিংটনের রুশ ডিজেল কেনার জন্য বিশেষ আইনি ব্যাখ্যা বা সাময়িক ছাড়ের প্রয়োজন হয়, তবে ভারতের কেনাকাটার ওপর কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে—তা প্রমাণ করা কঠিন হবে। তবে এর বিপরীতটাও ঘটতে পারে; কংগ্রেসের বিরোধিতার কারণে ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে আরও কঠোর প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে বাধ্য হতে পারেন, এমনকি তাঁর প্রশাসন নিজের জন্য নমনীয়তা চাইলেও।

ভারত কি বিশেষ ছাড় পাবে?

ওয়াশিংটন এই ছাড়ের কাঠামো কীভাবে তৈরি করে, তার ওপর ভারত নজর রাখছে। একটি ইটি (ঊঞ) প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে যে, ট্রাম্পের ঘোষণার প্রভাব পর্যালোচনা করছে ভারত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া ও ইরান নিষেধাজ্ঞা আইন আনুষ্ঠানিকভাবে না ভেঙে নিজের আমদানির জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। ৩০ সেপ্টেম্বর ট্রাম্প ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে কথা হওয়া সত্ত্বেও ভারতকে ছাড় দেওয়ার বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

ভারতের জন্য এই ইস্যুর গুরুত্ব কেবল তাৎক্ষণিক শুল্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাশিয়া থেকে জ্বালানি ক্রয় আমদানির বিকল্প পথ তৈরি করেছে এবং ভারতীয় রিফাইনারিগুলোকে খরচ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেছে। কিছু রুশ অপরিশোধিত তেল ভারতে প্রক্রিয়াজাত করা হয় এবং ডিজেলসহ প্রক্রিয়াজাত পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়। এটি ওয়াশিংটনের জন্য অতিরিক্ত জটিলতা তৈরি করেছে। সাবেক মার্কিন কূটনীতিক স্টিফেন মুল ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’কে জানিয়েছেন যে, ভারতের এখানে নিজস্ব দরকষাকষির সুযোগ রয়েছে, কারণ তাদের কেনা রুশ অপরিশোধিত তেলের একাংশ প্রক্রিয়াজাত হয়ে মার্কিন বাজারেও পৌঁছায়।

মুল যুক্তি দেন, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলে ভারতের জবাব দেওয়ার বিকল্প পথ রয়েছে এবং ট্রাম্পকে তাঁর হিসাব-নিকাশে সেই সম্ভাবনাগুলোও যুক্ত করতে হবে। পাল্টা পদক্ষেপ নিলে বাণিজ্য আলোচনা এবং পাকিস্তান নীতি নিয়ে ওয়াশিংটনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিদ্যমান টানাপোড়েন আরও গভীর হতে পারে।

ওয়াশিংটন হয়তো অপরিশোধিত তেল কেনা এবং জাহাজে আগে থেকে লোড করা ডিজেলের সাময়িক ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য তৈরি করতে পারে। আইনি দিক থেকে এই যুক্তি গুরুত্ব পেলেও তা রাজনৈতিক দ্বিমুখী নীতি ঢেকে রাখতে পারবে না।

যে কঠিন সত্য ট্রাম্প হয়তো এখনো স্বীকার করবেন না

ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে তিনি এখন ভারতের অবস্থান পুরোপুরি মেনে নেবেন। তিনি জোর দিয়ে বলতে পারেন যে আমেরিকার এই ব্যবস্থা সাময়িক, নির্দিষ্ট পরিসরে সীমাবদ্ধ এবং কেবল বিশেষ সরবরাহ সংকট মোকাবেলার জন্য তৈরি। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর জ্বালানির দামের তাৎক্ষণিক চাপ কমে গেলে তিনি আবার কঠোর নিষেধাজ্ঞা নীতিতে ফিরে যেতে পারেন।

যদি জ্বালানির দাম বেশি থাকে, তবে তা যেখান থেকেই আসুক না কেন, প্রশাসন সরবরাহ খুঁজে বের করার চাপে থাকবে। আর দাম কমে গেলে, ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করার এবং রুশ জ্বালানি ক্রেতা দেশগুলোর ওপর চাপ বজায় রাখার বড় সুযোগ পাবেন। যেভাবেই দেখা হোক না কেন, নীতির নির্দেশক নীতিটি ওয়াশিংটনের পূর্বে দাবি করা অবস্থানের মতো এতটা নিরঙ্কুশ নয়।

ওয়াশিংটনের ক্ষেত্রে একটি মানদণ্ড আর নয়া দিল্লির ক্ষেত্রে আরেকটি মানদণ্ড প্রযোজ্য হতে পারে না—এটি স্বীকার করার জন্য ট্রাম্পকে রাশিয়ার বিষয়ে ভারতের সম্পূর্ণ অবস্থান সমর্থন করতে হবে না। কিন্তু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় দলই তাঁর ডিজেল চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলায়, ভারতের জন্য কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া ট্রাম্পের পক্ষে রাজনৈতিকভাবে আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিক্স টাইমস

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top