পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পে ফিক্সেশনের জন্য শিক্ষকপ্রতি ২০০ টাকা করে আদায়ের অভিযোগ উঠেছে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির (তোতা গ্রুপ) নেতাদের বিরুদ্ধে। হিসাবরক্ষণ অফিস ‘ম্যানেজ’ করা ও সংশ্লিষ্ট খরচের কথা বলে এ অর্থ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক। উপজেলার ৬৭৩ জন শিক্ষকের কাছ থেকে এ হারে টাকা নেওয়া হলে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬০০ টাকা।
গত ১৪ অক্টোবর উপজেলা পরিষদ হলরুমে মাসিক সমন্বয় সভায় শিক্ষকপ্রতি ২০০ টাকা আদায়ের প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক প্রধান শিক্ষক। এ প্রস্তাবের জন্য উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও ছত্রশিকারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আসাদুল্লাহ আজাদকে দায়ী করেছেন তাঁরা। সভায় সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আনোয়ার সাহাদাৎ ও রাশেদুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থিত একাধিক প্রধান শিক্ষক জানান, কয়েকজন প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও অন্য শিক্ষকদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ার মুখে পড়েন। একপর্যায়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেককে প্রস্তাবে সম্মতি দিতে হয়। অন্যথায় ভবিষ্যতে বিড়ম্বনায় পড়ার আশঙ্কা ছিল তাঁদের। পরে প্রধান শিক্ষকদের মাধ্যমে সহকারী শিক্ষকদের কাছেও অর্থ দেওয়ার বিষয়টি পৌঁছে যায়।
প্রতিবেদকের হাতে থাকা হোয়াটসঅ্যাপের একটি স্ক্রিনশটে দেখা যায়, পে ফিক্সেশন কার্যক্রমে সহায়তার জন্য গত শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে ক্লাস্টারভিত্তিক ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকতে শিক্ষকদের বার্তা দেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও বানিয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হেদায়েতুল ইসলাম বসুনিয়া শান্তনু। বিদ্যালয়গুলো হলো টেপ্রীগঞ্জ, দেবীগঞ্জ মডেল, সোনাহার-৩, কুলুরহাট, ফুলবাড়ি ও কালীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বার্তায় ৩১ জন শিক্ষকের নামের পাশাপাশি ‘সার্বিক সহযোগিতায়’ সমিতির সভাপতি আসাদুল্লাহ আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক শান্তনুর নাম উল্লেখ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই দিন শিক্ষকেরা নির্ধারিত বিদ্যালয়গুলোতে গিয়ে পে ফিক্সেশনের অনলাইন কার্যক্রম সম্পন্ন করেন। এ সময় শিক্ষকপ্রতি ২০০ টাকা করে দেওয়ার বিষয়টিও সামনে আসে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সহকারী শিক্ষক জানান, প্রধান শিক্ষকের মাধ্যমে তিনি ২০০ টাকা দিয়েছেন। হিসাবরক্ষণ অফিসের খরচ ও পে ফিক্সেশনের কাজ দেখভালকারীদের জন্য এ অর্থ নেওয়া হচ্ছে বলে তাঁকে জানানো হয়েছিল।
আরেক শিক্ষক জানান, তিনি নিজেই অনলাইনে কাজ করায় টাকা দেননি। তবে শিক্ষকপ্রতি ২০০ টাকা নির্ধারণের বিষয়টি নিশ্চিত করেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে আসাদুল্লাহ আজাদ বলেন, “পে ফিক্সেশনের জন্য আমি অর্থ আদায়ের বিষয়ে কিছু বলিনি। আমি এসবের মধ্যে নেই। কে বা কারা টাকা তুলল, তা আমি জানি না। বরং পরে যখন টাকার বিষয়টি শুনেছি, তখন আমি প্রতিবাদ করেছি।”
একই সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হেদায়েতুল ইসলাম বসুনিয়া শান্তনুও পে ফিক্সেশনের জন্য টাকা তোলার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর দাবি, অসুস্থ সহকর্মীদের আর্থিক সহায়তার জন্য অর্থ সংগ্রহের কথা হয়েছিল। তিনি বলেন, “আমাদের দুইজন সহকর্মী ও অপর দুই সহকর্মীর দুই সন্তান গুরুতর অসুস্থ। তাদের আর্থিক সহযোগিতার জন্য টাকা উত্তোলনের কথা হয়েছিল।”
তবে সভায় উপস্থিত তিনজন শিক্ষক জানিয়েছেন, অসুস্থ সহকর্মীদের আর্থিক সহায়তা এবং পে ফিক্সেশনের জন্য অর্থ সংগ্রহ দুটি পৃথক বিষয়।
এ বিষয়ে উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. আল-মামুন রশীদ বলেন, ১৪ অক্টোবর কয়েকজন শিক্ষক তাঁর কার্যালয়ে কাজের বিষয়ে পরামর্শ নিতে এসেছিলেন। এর বাইরে আর কোনো কথা হয়নি। পে ফিক্সেশনের কাজে অহেতুক কাউকে হয়রানি করা হবে না বলেও জানান তিনি।
সভায় উপস্থিত থেকেও অর্থ আদায়ের বিষয়ে কিছু জানেন না বলে দাবি করেছেন উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনোয়ার সাহাদাৎ। তিনি বলেন, “এটা শিক্ষকদের বিষয়। কাজটা ওনারা নিজেরাই করবেন। তারা কীভাবে ম্যানেজ করবেন, এটা তাদের ব্যাপার। আর্থিক বিষয়ে আমি কিছু জানি না।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজমল হোসেন বলেন, “কোনো শিক্ষক আমাকে বলেনি। আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। কোনো শিক্ষক যদি আমাকে না জানায়, তাহলে কী ব্যবস্থা নিব?”



