বেসরকারি ক্লিনিকে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় প্রসূতির পেটের ভেতর গজ কাপড় রেখে সেলাই করে দেওয়ার কারণে তরুণী রাহী মুনীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসকসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে বুধবার (৭ অক্টোবর) দুপুরে নওগাঁ সদর ১ নম্বর আমলি আদালতের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এ আদেশ দেন।
পরোয়ানাভুক্ত আসামিরা হলেন—অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসক ফাবলিহা সাদিয়া শাফীন (২৯), অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ডা. মো. আখেরুজ্জামান রবি (৩৩), মেট্রো হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মো. রিপন আলী (৩৭), অপারেশন থিয়েটার (ওটি) ইনচার্জ মোছা. সালমা বিবি নাজমা (৩২) এবং দালাল চক্রের দুই সদস্য মো. রাশেদুল ইসলাম হিরু (৩৩) ও মো. নাহিদ বাবু (২২)।
মামলার নথি ও আদালত সূত্রে জানা যায়, গত ৬ এপ্রিল নওগাঁ শহরের দক্ষিণ সুলতানপুর এলাকার বাসিন্দা প্রসূতি রাহী মুনী তীব্র প্রসববেদনা নিয়ে নওগাঁ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত দালাল চক্রের খপ্পরে পড়েন তাঁর পরিবার। উন্নত চিকিৎসার মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে মাত্র ৮ হাজার টাকার চুক্তিতে তাঁকে শহরের বেসরকারি ‘মেট্রো হাসপাতালে’ নিয়ে যাওয়া হয়। ওই রাতেই ডা. ফাবলিহা সাদিয়া শাফীন তাঁর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। তবে অস্ত্রোপচারের পরপরই পেটের ভেতর রেখে দেওয়া তুলো ও গজ কাপড়ের কারণে রাহীর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠে এবং তীব্র যন্ত্রণায় তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে।
রোগীর পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দায় এড়াতে পরদিন তড়িঘড়ি করে দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার চালায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সে সময় পেট থেকে ভুলে ফেলে রাখা গজ কাপড়টি বের করে এনে পুনরায় ক্ষতস্থান সেলাই করে দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে রোগীর অভ্যন্তরীণ সংক্রমণ মারাত্মক রূপ নেওয়ায় তাঁর অবস্থার আর কোনো উন্নতি হয়নি। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ এপ্রিল মারা যান রাহী মুনী। ঘটনার পর স্বাস্থ্য বিভাগের সরেজমিন তদন্তে বেরিয়ে আসে, অস্ত্রোপচার চালানো ‘মেট্রো হাসপাতাল’ ক্লিনিকটি সম্পূর্ণ অবৈধ ও সরকারি নিবন্ধনহীন একটি প্রতিষ্ঠান ছিল।
চিকিৎসকের এমন দায়িত্বহীনতা ও অবৈধ ক্লিনিকের দৌরাত্ম্য নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট আদালতের নজরে আসে। গত ১৩ এপ্রিল আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে (সুয়োমোটো) ঘটনাটি আমলে নেন এবং ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের নির্দেশ দেন পিবিআইকে। দীর্ঘ তদন্ত শেষে গত ২২ আগস্ট ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ছয়জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে পিবিআই।
বুধবার নির্ধারিত দিনে পিবিআইয়ের দাখিল করা সেই তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা শেষে আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে মূল অভিযুক্ত চিকিৎসকসহ ছয় আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দেন।



