আইডি কার্ড থেকে এআই কর্নার, এক শিক্ষকের উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে বিদ্যালয়ের চিত্র

 

‘শিক্ষার্থীর পরিচয়-ই তার গৌরব’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে ব্যতিক্রমী উদ্যোগে বদলে যাচ্ছে নাটোরের লালপুর উপজেলার বাহাদীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদানের পরিবেশ। শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড) বিতরণ, মা সমাবেশ এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সৃজনশীলতাভিত্তিক বিভিন্ন কর্নার চালুর মাধ্যমে বিদ্যালয়টিকে আনন্দময় ও শিক্ষার্থীবান্ধব করে তোলার চেষ্টা চলছে। শিক্ষক মো. আব্দুল ওয়াদুদের উদ্যোগে নেওয়া এসব কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যালয় সংশ্লিষ্টরা।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবভিত্তিক জ্ঞান, বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা বাড়াতে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। এর অংশ হিসেবে চালু করা হয়েছে বিজ্ঞান কর্নার, বিজ্ঞান বাগান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কর্নার, আইকিউ কর্নার, ‘জ্ঞানকুঞ্জ’ পাঠাগার, শিক্ষা উপকরণ কর্নার, ফার্স্ট এইড কর্নার, আইসিটি কর্নার ও রেজিস্টার কর্নার। পাশাপাশি রয়েছে দেয়ালিকা, হেল্প বক্স, হারানো-প্রাপ্তির ঝুড়ি এবং ‘ওয়ান ডে ওয়ান ওয়ার্ড’ কার্যক্রম।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ৭৪ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা, বিদ্যালয়ের প্রতি আকর্ষণ তৈরি এবং পড়াশোনাকে আনন্দময় করে তুলতেই এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মা সমাবেশের মাধ্যমে সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা এবং বিদ্যালয়ের কার্যক্রমে তাঁদের সম্পৃক্ত করার চেষ্টা চলছে।
উদ্যোগের বিষয়ে শিক্ষক মো. আব্দুল ওয়াদুদ কালের কন্ঠকে বলেন, “শিক্ষার্থীর পরিচয় শুধু তার নাম বা রোল নম্বরে সীমাবদ্ধ নয়; বিদ্যালয়ের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা, শৃঙ্খলাবোধ ও শেখার আগ্রহও তার পরিচয়ের অংশ। ‘শিক্ষার্থীর পরিচয়-ই তার গৌরব’—এই ভাবনা থেকেই আইডি কার্ড বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা যেন আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারে, নিজেদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ পায় এবং বাস্তবজীবনের সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের মিল খুঁজে পায়, সে জন্য বিভিন্ন কর্নার চালু করা হয়েছে। এ কাজে সহকর্মী শিক্ষক ও অভিভাবকদের সহযোগিতা প্রয়োজন। আমাদের লক্ষ্য, প্রতিটি শিশুকে বিদ্যালয়মুখী করা এবং তাদের জন্য একটি আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা।”
পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. মুরসালিন আহম্মেদ বলে, “আইডি কার্ড পেয়ে আমাদের খুব ভালো লাগছে। এখন বিদ্যালয়ে নিজেদের আলাদা পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে। নতুন নতুন কর্নার ও শিক্ষা উপকরণের মাধ্যমে আমরা আনন্দের সঙ্গে শিখতে পারব।”
একই শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছা. সামিয়া জান্নাত রুহী বলে, “বিজ্ঞান বাগান, পাঠাগার ও বিভিন্ন কর্নার আমাদের নতুন কিছু শিখতে সাহায্য করবে। এতে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ বাড়বে এবং বিদ্যালয়ে আসতেও ভালো লাগবে।”
অভিভাবক মোছা. শরিফা খাতুন বলেন, “শিশুদের পড়াশোনায় ভালো করতে বিদ্যালয় ও পরিবারকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মা সমাবেশের মাধ্যমে শিক্ষকদের সঙ্গে সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ পাচ্ছি। এ ধরনের উদ্যোগ শিশুদের শেখার আগ্রহ বাড়াবে।”
অভিভাবক মোছা. লাইলি বেগমের প্রত্যাশা, আনন্দময় পরিবেশে শেখার সুযোগ পেলে শিশুরা পড়াশোনায় আরও মনোযোগী হবে। বিদ্যালয়ের এসব উদ্যোগ তাদের মেধা ও সৃজনশীলতা বিকাশে সহায়ক হবে।
সহকর্মী শিক্ষক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ও পাঠদানে মনোযোগ বাড়াতে আব্দুল ওয়াদুদের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি হাতে-কলমে শেখার সুযোগ তৈরি হলে শিক্ষার্থীরা বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারবে।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. মোশাররফ হোসেন কালের কন্ঠকে বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে পরিচয়পত্র বিতরণ, মা সমাবেশ ও বিভিন্ন শিক্ষামূলক কর্নারের মাধ্যমে বিদ্যালয়কে আরও শিক্ষার্থীবান্ধব করার চেষ্টা চলছে। এ কাজে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।
উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ঝর্ণা মণ্ডল কালের কন্ঠকে বলেন, প্রাথমিক শিক্ষায় আনন্দময় ও শিশুবান্ধব পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা কালের কন্ঠকে বলেন, শিক্ষার্থীদের ভিত্তি মজবুত করতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি বিজ্ঞানমনস্কতা, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। বিদ্যালয়ের এ ধরনের উদ্যোগ শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top