চীনে ফেরত পাঠালে নির্যাতনের ঝুঁকি, দুই উইঘুরকে নিয়ে থাইল্যান্ডকে সতর্ক করল এইচআরডব্লিউ

চীনে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হলে নির্যাতন ও অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন, এমন দুই উইঘুর পুরুষকে জোর করে ফেরত পাঠানো থেকে থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষের বিরত থাকা উচিত বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। আজ সংস্থাটি এ কথা জানায়।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করা ওই দুই ব্যক্তিকে রাজকীয় ক্ষমা পাওয়ার পর কারাগার থেকে ব্যাংককের অভিবাসন আটককেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তাঁদের দেশ থেকে বহিষ্কারের প্রস্তুতি হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, “থাইল্যান্ডের আগের সরকারগুলো বছরের পর বছর উইঘুরদের অমানবিক পরিবেশে আটক রেখেছে। এরপর বেইজিংয়ের দাবির কাছে নতি স্বীকার করে তাঁদের চীনে পাঠিয়েছে, যেখানে তাঁদের জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের উচিত চীনে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর প্রথা বন্ধ করা এবং ওই দুই উইঘুর পুরুষকে নিরাপদ তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া।”

২০১৪ সাল থেকে থাই কর্তৃপক্ষের হাতে আটক রয়েছেন ওই দুই উইঘুর পুরুষ। তাঁদের একজনকে আটকের সময় বয়স ছিল মাত্র ১৪ বছর। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে অভিবাসন আটককেন্দ্র থেকে পালানোর চেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধে তাঁদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের ২১ অক্টোবর সাত বছরের কারাদণ্ডের অধিকাংশ সময় সাজা ভোগের পর তাঁদের ব্যাংকক সেন্ট্রাল প্রিজন থেকে ব্যাংকক ইমিগ্রেশন ডিটেনশন সেন্টার সুয়ান ফ্লুতে স্থানান্তর করা হয়। থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা একটি সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছেন, গত আগস্টে ব্যাংককে অবস্থিত চীনা দূতাবাস তাঁদের চীনে ফেরত পাঠানোর দাবি জানিয়েছিল।

থাইল্যান্ডের অভিবাসন আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী, ওই দুই উইঘুর পুরুষ বহিষ্কারের বিরোধিতা না করলে এবং তাঁদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না হলে চীনে ফেরত পাঠানো হবে। তাঁদের প্রতিনিধিত্বকারী আইনজীবীরা হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, চীনে পাঠানোর বিষয়ে ওই দুই ব্যক্তি সম্মতি দেননি বলে তাঁরা ইতিমধ্যে থাই কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছেন। শরণার্থী হিসেবে তাঁদের অবস্থান নির্ধারণের জন্য জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) যেন তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারে, সে সুযোগ বারবার প্রত্যাখ্যান করেছে থাইল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ।

আন্তর্জাতিক আইনের ‘নন-রিফাউলমেন্ট’ বা জোরপূর্বক ফেরত না পাঠানোর নীতি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে থাই সরকারের। এ নীতি অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তিকে এমন স্থানে জোর করে ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ, যেখানে তিনি নিপীড়ন, নির্যাতন বা অন্য কোনো ধরনের দুর্ব্যবহারের প্রকৃত ঝুঁকিতে পড়তে পারেন কিংবা তাঁর জীবন বা অন্যান্য তুলনীয় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কা রয়েছে। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। থাইল্যান্ড এ সনদের পক্ষভুক্ত দেশ। প্রথাগত আন্তর্জাতিক আইনেও এ ধরনের ফেরত পাঠানো নিষিদ্ধ। এ ছাড়া থাইল্যান্ডের নির্যাতন ও জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও দমন আইন অনুযায়ী, নির্যাতন বা দুর্ব্যবহারের যথেষ্ট ঝুঁকি থাকলে কাউকে বহিষ্কার করা নিষিদ্ধ।

২০১৪ সালের মার্চে মালয়েশিয়া সীমান্তের কাছে থাইল্যান্ডের সোংখলা প্রদেশে পুলিশ প্রায় ২২০ জন উইঘুর পুরুষ, নারী ও শিশুকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়। এর কিছুদিন পর তাঁদের ব্যাংককের একটি অভিবাসন আটককেন্দ্রে স্থানান্তর করা হয়। একই সময়ের আশপাশে পৃথক কয়েকটি ঘটনায় কর্তৃপক্ষ আরও কয়েক ডজন উইঘুরকে গ্রেপ্তার করে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিবাসন আটককেন্দ্রে রাখে।

২০১৫ সালের জুলাইয়ে সোংখলায় আটক উইঘুর নারী ও শিশুদের মধ্যে প্রায় ১৭০ জনকে তুরস্কে মুক্তি দিয়ে পাঠানো হয়। তবে এর এক সপ্তাহ পর থাই কর্তৃপক্ষ ১০০ জনের বেশি উইঘুর পুরুষকে জোরপূর্বক চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেয়। পরে তাঁদের উড়োজাহাজে করে চীনে নিয়ে যাওয়া হয়।

২০২৫ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি থাই কর্তৃপক্ষ অভিবাসন আটককেন্দ্র থেকে ৪০ জন উইঘুর পুরুষকে নিয়ে জোরপূর্বক চীনে ফেরত পাঠায়। তাঁদের ফেরত পাঠানোর পর থাই কর্তৃপক্ষ চীনা সরকারের আয়োজিত একটি প্রচারণামূলক সফরে অংশ নেয়। ওই সফরে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের কয়েকজনকে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে দেখা যায়। থাই ও চীনা কর্তৃপক্ষের প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ফেরত পাঠানো ওই উইঘুরদের বিষয়ে এরপর থেকে বিশ্বাসযোগ্য কোনো পর্যবেক্ষণ হয়নি।

বহিষ্কারের এক বছর পূর্তিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা একটি বিবৃতি দেন। এতে তাঁরা বলেন, ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা “কোনো যোগাযোগ পাননি, তাঁদের আটকস্থল বা অবস্থান সম্পর্কে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাননি এবং তাঁদের প্রিয়জনেরা আদৌ বেঁচে আছেন কি না, সে সম্পর্কেও কোনো ইঙ্গিত পাননি।”

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওই বহিষ্কারের পর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক বলেন, এটি “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ডের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন”। তিনি থাই কর্তৃপক্ষকে আহ্বান জানান, “যাতে আর কাউকে বহিষ্কার করা না হয় এবং শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের সম্ভাব্য সদস্যসহ থাইল্যান্ডে আটক গোষ্ঠীটির অবশিষ্ট সদস্যরা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে দেশটির বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী পূর্ণ সুরক্ষা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।”

উইঘুররা তুর্কি ভাষাভাষী মুসলিম জনগোষ্ঠী। তাঁদের অধিকাংশই চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বসবাস করেন। গত ১০ বছরে উইঘুরদের ওপর চীনের দমন-পীড়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ সময়ে কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যাপক ও পরিকল্পিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযান জোরদার করেছে, যার কয়েকটি মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।

কর্তৃপক্ষ উইঘুর জনগোষ্ঠীকে নির্বিচারে আটক, অন্যায়ভাবে কারাবন্দি, ব্যাপক নজরদারি, জোরপূর্বক শ্রম, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নিপীড়ন এবং চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের শিকার করেছে। যেসব উইঘুরকে অবৈধভাবে চীন ত্যাগ করেছেন বলে মনে করা হয়, তাঁদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো হলে তাঁদের প্রতি তীব্র সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা হয়। এরপর তাঁদের নির্বিচারে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ, নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক ও অবমাননাকর আচরণের শিকার হতে হয়।

এলেইন পিয়ারসন বলেন, “৯ নভেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদে থাইল্যান্ডের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার আগে বিভিন্ন দেশের সরকারের উচিত উইঘুরদের সঙ্গে থাইল্যান্ডের কর্তৃপক্ষের অবমাননাকর আচরণ অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করা। নিপীড়ন থেকে পালিয়ে আসা উইঘুরদের সুরক্ষা দেওয়া উচিত থাই কর্তৃপক্ষের, তাঁদের কারাবন্দি করা নয়। আর কোনোভাবেই তাঁদের বিপদের মুখে ফেরত পাঠানো উচিত নয়।”

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top