কয়রায় ইকোট্যুরিজমের হাতছানি: টেকসই পর্যটনে বাঁচবে সুন্দরবন, খুলবে উপকূলের নতুন দুয়ার

‎​একদিকে কপোতাক্ষ ও শাকবাড়িয়ার শান্ত জলরাশি, অন্যদিকে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। নদী, বন, বন্যপ্রাণী, মুন্ডা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা এবং শতাব্দীর প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে খুলনার কয়রা উপজেলায়। পরিকল্পিত উদ্যোগ ও আধুনিক পরিকাঠামো গড়ে তুলতে পারলে উপকূলের এই উপজেলাটিই হতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান ‘ইকোট্যুরিজম’ গন্তব্য। আজ ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসে টেকসই পর্যটনের যে বার্তা বিশ্বজুড়ে ধ্বনিত হচ্ছে, তার প্রকৃত বাস্তবায়ন সম্ভব সুন্দরবনঘেঁষা এই সম্ভাবনাময় জনপদে।
‎​খুলনা জেলা শহর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত কয়রার ভৌগোলিক অবস্থান একে পর্যটনের জন্য অনন্য করে তুলেছে। সড়ক বা নদীপথে সহজ যোগাযোগ এবং তুলনামূলক কম খরচে ভ্রমণের সুযোগ থাকলেও কয়রার বিপুল পর্যটন সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। ​কয়রা সদরের ৬ নম্বর কয়রা গ্রামে শাকবাড়িয়া নদীর তীরে নির্মাণাধীন রয়েছে ‘সুন্দরবন পর্যটন কেন্দ্র (কেওড়াকাটা)’। কেন্দ্রটি চালুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তবে কাজের ধীরগতির কারণে সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিচ্ছে না। পর্যটন কেন্দ্রটিকে ঘিরে স্থানীয় আদিবাসী মুন্ডা জনগোষ্ঠীর জীবনচিত্র ও সংস্কৃতি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরার বড় সুযোগ রয়েছে। এছাড়া ৪ নম্বর কয়রা লঞ্চঘাট, কাটকাটা ও গোবরা ম্যানগ্রোভ বনকে ঘিরেও দৃষ্টিনন্দন স্পট গড়ে তোলা সম্ভব।
​এক সফরেই নদী, বন ও ৪০০ বছরের ইতিহাস
‎​কয়রা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর ঝুলিতে রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। ​প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ  আমাদী ইউনিয়নের ঐতিহাসিক মসজিদকুঁড় মসজিদ, বুড়া খাঁ ও ফতে খাঁর বসতভিটার অবশেষ, চাল ধোয়ার দীঘি এবং হাতি বাঁধার দীঘি ইতিহাসপ্রেমীদের আকৃষ্ট করার মতো।
​কয়রার কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশন থেকে পাস নিয়ে সহজে যাওয়া যায় সুন্দরবনের গভীরের শেখেরটেক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র (যেখানে রয়েছে প্রায় ৪০০ বছরের প্রাচীন মন্দির), কালাবগী, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর ও বিখ্যাত শুঁটকি পল্লীতে।
‎​বন রক্ষায় নতুন দিগন্ত ​সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে বাওয়ালি, মৌয়াল ও জেলেদের জীবন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কয়রায় পর্যটন শিল্প বিকশিত হলে পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, হস্তশিল্প, ট্যুর গাইড ও স্থানীয় খাবারের বাজার প্রসারের মাধ্যমে বিপুল বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি হবে। এতে বনের ওপর অতিরিক্ত চাপ ও নির্ভরতা বহুগুণে কমবে।
​কয়রা কপোতাক্ষ কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ ওলিউল্লাহ বলেন, “সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগে আবাসন, স্যানিটেশন ও নিরাপত্তা জোরদার করা গেলে কয়রা ইকোট্যুরিজমের স্বর্গে পরিণত হবে। এতে স্থানীয় অর্থনীতির পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে।” ​উপকূলীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্ট (আইসিডি)’-এর প্রতিষ্ঠাতা আশিকুজ্জামান ২০১৮ সাল থেকে কয়রায় পর্যটন কেন্দ্র চালুর দাবি জানিয়ে আসছেন। তিনি দ্রুত কেওড়াকাটা পর্যটন কেন্দ্রটির কাজ শেষ করে পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়ার জোর দাবি জানান।
‎​কয়রাকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন সার্কিট গড়ে তুলতে কেবল অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন:নিরাপদ ও মানসম্মত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পর্যটক নিরাপত্তা। পরিবেশবান্ধব নৌযান, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষিত গাইড। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রেখে ‘গ্রিন ট্যুরিজম’ বা টেকসই পর্যটন নীতি বাস্তবায়ন।
‎​সঠিক পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমেই কয়রা হয়ে উঠতে পারে নদী, ইতিহাস ও বনভিত্তিক পর্যটনের নতুন ঠিকানা—যা উপকূলীয় মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের পাশাপাশি বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনকেও দেবে কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা।
‎

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে সালমান মুক্তাদির বললেন, ‘আপনি পুরোপুরি ডিটাচড’

স্টুডিও ভাঙচুরের জেরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছেন জনপ্রিয়

Scroll to Top