বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রক্ষায় একদিকে চলছে বনদস্যু ও শিকারিদের সাথে অদৃশ্য লড়াই, অন্যদিকে প্রকট জনবল সংকট। “ঢাল নেই তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার”—প্রবাদটি যেন বর্তমানে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের খুলনা রেঞ্জের বনরক্ষীদের ভাগ্যের সাথে মিলে গেছে। তবে সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গত এক বছরে অপরাধ দমনে রেকর্ড পরিমাণ সাফল্য দেখিয়েছে বন বিভাগ।
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বন অপরাধ দমনে সাঁড়াশি অভিযান চালানো হয়েছে। প্রাপ্ত পরিসংখ্যান বলছে:
মামলা ও আটক: গত এক বছরে মোট ২৭৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, যেখানে আটক করা হয়েছে ৪৯৪ জন আসামিকে। বর্তমানে ৪৫ জন আসামি পলাতক রয়েছে।
জব্দকৃত সম্পদ: অভিযানে ১৯১টি নৌকা, ৩৪টি ট্রলার এবং প্রায় ১,৩০৫ ঘনফুট কাঠ উদ্ধার করা হয়েছে।
বনজ ও মৎস্য সম্পদ: ১,৫৫০ কেজি মাছ, ১,৫২৯ কেজি কাঁকড়া এবং ৩৯ কেজি মধু জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া বন্যপ্রাণী রক্ষায় উদ্ধার করা হয়েছে ৩৯ কেজি হরিণের মাংস, বিপুল পরিমাণ হরিণ ধরার ফাঁদ এবং ২৪০ বোতল নিষিদ্ধ বিষ।
কাগজে-কলমে সুন্দরবন রক্ষার দায়িত্ব থাকলেও বাস্তবে বনের প্রতিটি কোণ পাহারায় পর্যাপ্ত লোকবল নেই। মঞ্জুরিকৃত ১,১৯০টি পদের মধ্যে বর্তমানে ৩২৩টি পদই শূন্য।
উদ্বেগজনক শূন্যতা: দ্বিতীয় শ্রেণির ৩০টি ফরেস্ট রেঞ্জার পদের মধ্যে ২৭টিই ফাঁকা। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ পদ খালি রেখেই চলছে তদারকি।
মাঠ পর্যায়ের সংকট: ফরেস্টার, সারেং এবং ইঞ্জিনম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ও মাঠ পর্যায়ের পদগুলো দীর্ঘকাল ধরে অপূর্ণ। বিশেষ করে ৪৫টি ডেপুটি রেঞ্জার পদের সবকটিই (৪৫টি) শূন্য থাকায় প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
”আমাদের আওতায় শুধু নীলকমল টহল ফাঁড়িতেই প্রায় দুইশ খাল রয়েছে। বিশাল বঙ্গোপসাগর এলাকায় টহল দিতে হয়, অথচ আমাদের কোনো দ্রুতগামী বা ভারী নৌযান নেই।” > — মোঃ নজরুল ইসলাম, স্টাফ, নীলকমল টহল ফাঁড়ি।
সংকটের মুখেও কেন বাড়ছে সাফল্য?
বন কর্মকর্তাদের দাবি, বর্তমানে বিচ্ছিন্ন অপরাধের চেয়ে বড় সিন্ডিকেটগুলোকে টার্গেট করে অভিযান চালানো হচ্ছে। স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর ফলে মামলা ও আটকের সংখ্যা বেড়েছে। তবে আধুনিক নৌযান ও পর্যাপ্ত ফরেস্ট গার্ড না থাকায় রাতের অন্ধকারে চোরা শিকারিদের ধাওয়া করা অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য
সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাসানুর রহমান জানান, জনবল নিয়োগ না হওয়ায় স্বাভাবিক বন রক্ষা কার্যক্রম সংকুচিত হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, “চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ বা জনবল না থাকলেও আমরা সীমিত সম্পদ দিয়েই সর্বাত্মক চেষ্টা করছি বনের সম্পদ রক্ষা করতে।”
বিশেষজ্ঞদের মত: বনের প্রতিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় অবিলম্বে শূন্যপদ পূরণ এবং আধুনিক নৌযান নিশ্চিত করা না হলে, এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সুন্দরবনের ভবিষ্যৎ এখন অনেকাংশেই ঝুলে আছে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপর।












