সাম্প্রতিক
গ্যালারি কাঁপানো কে এই তুর্কি সমর্থক? ‘ইসলামী ব্যাংক থেকে ৮৩ হাজার কোটি ঋণ নিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’, বলেননি বাবর তদন্তে মিলল না জামায়াত নেতার দাবি, চাঁদাবাজির অভিযোগই জোরালো মন্ত্রীর পেছনে আমরা টাকা নিয়ে ঘুরিনি: আদ্-দ্বীন কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগমের জামিন বাজেটে মোট ঘাটতি দুই লাখ কোটি টাকা, কমছে সরকারি ব্যয়: সংসদে অর্থমন্ত্রী বাগেরহাটের মংলায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত ২০ মান্দায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন হেনস্তার অভিযোগে বিদ্যালয় ঘেরাও, প্রধান শিক্ষক পলাতক বরিশালে নিখোঁজ অটোরিকশা চালকের বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার বৃদ্ধা শিপ্রা রানীর পাশে জেলা প্রশাসন

তদন্তে মিলল না জামায়াত নেতার দাবি, চাঁদাবাজির অভিযোগই জোরালো

মঙ্গলবার,১৬ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের উপকূল রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ বেড়িবাঁধ প্রকল্প কেন্দ্র করে বিতর্কের নতুন মোড় এসেছে।

দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ তুলে কাজ বন্ধের আন্দোলন করে আসছিলেন, বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ সদস্য হাজী মো. নজরুল ইসলাম। তবে সরকারি তদন্তে তার দাবির পক্ষে কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।

সাত সদস্যের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যে জমি চেয়ারম্যান নিজের লিজকৃত বলে দাবি করছিলেন, প্রকৃতপক্ষে সেটি পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তি। ফলে শুরু থেকেই প্রকল্পে বাধা দেওয়ার পেছনে জমির মালিকানার দাবি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের পর এখন নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের সেই অভিযোগ, চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে মোটা অঙ্কের অর্থ দাবি করেছিলেন এবং দাবি পূরণ না হওয়ায় কাজে বাধা দেওয়া হয়েছিল।

জানা গেছে, জাইকার অর্থায়নে শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ও কাশিমারী ইউনিয়নে প্রায় আড়াই কিলোমিটার টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ চলছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আর-রাদ করপোরেশন অভিযোগ করে, স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পে বাধা দিচ্ছেন। এ নিয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।

পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করলে পানি সম্পদ মন্ত্রীর নির্দেশে ১ জুন শ্যামনগর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে একটি বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য, পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, প্রশাসনের প্রতিনিধিরা, বিএনপি ও জামায়াতের নেতারা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

সেই সভায় হাজী নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রকল্পের সিসি ব্লক কাস্টিং ইয়ার্ড তার লিজ নেওয়া জমিতে নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে তিনি আপত্তি জানিয়েছেন। তার এই দাবির সত্যতা যাচাইয়ে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। যেখানে শ্যামনগরের সহকারী কমিশনার, অফিসার ইনচার্জ, বাপাউবোর প্রতিনিধি, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, আর রাদ কর্পোরেশন ও বুড়িগোয়ালীনী ইউপি চেয়ারম্যানের প্রতিনিধিকে সদস্য করা হয়।

কমিটির সদস্যরা ৪ জুন সরেজমিন পরিদর্শন করে গত ৮ জুন তদন্ত প্রদিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে জামায়াতে ইসলামী এবং বুড়িগোয়ালীনী ইউপি চেয়ারম্যানের প্রতিনিধি স্বাক্ষর করেনি।

তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রকল্পের সিসি ব্লক কাস্টিং ইয়ার্ড যেখানে নির্মাণ করা হয়েছে, সেটি ওয়াপদা বাঁধ সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি এবং সরকারি খাস খতিয়ানভুক্ত সম্পত্তির মধ্যে অবস্থিত।

প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, আর-রাদ করপোরেশন যে জমি ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে তা ‘বিআরএস দাগ ৭০০১ ও ৭০০২’ এর অন্তর্ভুক্ত। এসব জমি যথাক্রমে সরকারি খাস জমি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন।

অন্যদিকে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম যে দাগ নম্বরের জমি নিজের লিজকৃত সম্পত্তি হিসেবে দাবি করেছিলেন, সেগুলোর অবস্থান প্রকল্পের ব্যবহৃত জমি থেকে আলাদা।

কমিটি আরও উল্লেখ করেছে, চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে হালনাগাদ কোনো বৈধ লিজ দলিলও উপস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমি কোনো ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের অনুকূলে উপজেলা খাস জমি বন্দোবস্ত কমিটি লিজ দিতে পারে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রকল্পের সাইটে ব্যবহৃত জমি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলামের লিজ নেওয়া জমি নয় এবং সেখানে আর-রাদ করপোরেশন বৈধভাবে শান্তিপূর্ণ দখলে রয়েছে বলে উল্লেখ করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনের পর প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের পুরোনো অভিযোগগুলো আবারও সামনে চলে এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশন এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, জমি নয়, মূলত চাঁদা না দেওয়ায় প্রকল্পে বাধা দেওয়া হচ্ছিল।

শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা আব্দুর রহমান বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন প্রসঙ্গে আমাদের দলের পক্ষ থেকে একটি কমিটি রয়েছে। কেন প্রতিবেদনটিতে স্বাক্ষর করা হয়নি, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানতে পারব। তবে যতটুকু জানি, সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান এ-সংক্রান্ত একটি মামলায় এখনো জামিন পাননি। তিনি জামিন পাওয়ার পর তার উপস্থিতিতে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি আবেদন করা হয়েছিল।

শ্যামনগরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) রাশেদ হোসাইন বলেন, পাঁচ কার্য দিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল। আমরা সে অনুযায়ী তদন্ত করেছি এবং তদন্তে যেটা পেয়েছি সেটাই রিপোর্টে দিয়েছি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের লিখিত অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বারবার প্রকল্প এলাকায় গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন এবং বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করেন। টাকা না দিলে প্রকল্প অফিস ভাঙচুর, যন্ত্রপাতি নষ্ট এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার হুমকি দেওয়া হয়।

আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান অভিযোগ করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তার কাছে ১২ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন সময় আরও চাপ সৃষ্টি করা হয়।

তার ভাষ্য, চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিকদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। সাব-ঠিকাদারদেরও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্প ঝুঁকিতে পড়ে যায়।

বিতর্ক এখানেই থেমে থাকেনি। গত ২৫ মে শ্যামনগর থানায় দায়ের করা এক মামলায় হাজী নজরুল ইসলাম ও তার ছেলে আব্দুর রহমানসহ ২৫ জনকে আসামি করা হয়। মামলায় চাঁদাবাজি, হামলা, কাজ বন্ধ করে দেওয়া এবং প্রকৌশলীকে মারধরের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এজাহারে বলা হয়, গত ১৯ মে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে চেয়ারম্যান ১৫ লাখ টাকা দাবি করেন এবং কাজ চালিয়ে গেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হত্যার হুমকি দেন।

পরে ২৩ মে প্রকল্প এলাকায় গিয়ে প্রকৌশলী জাহিদ হাসানকে মারধর এবং তার থেকে অ্যাপল স্মার্টওয়াচ ও মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে। মামলার বাদী দাবি করেছেন, পুরো ঘটনার ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ রয়েছে। এদিকে, মামলার পর থেকে পলাতক রয়েছেন নজরুল ইসলাম।

সব অভিযোগ বরাবরের মতো অস্বীকার করেছেন বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী নজরুল ইসলাম। তার দাবি, তিনি সরকারি সামাজিক বনায়নের জমি রক্ষার জন্য আপত্তি জানিয়েছেন এবং পরিবেশগত কারণে প্রকল্পের কিছু কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন।

তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমি কোনো চাঁদা দাবি করিনি।

এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে জমি সংক্রান্ত তার দাবির সত্যতা না মেলায় এখন প্রশ্ন উঠেছে, যে জমিকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে আন্দোলন, মানববন্ধন, কাজ বন্ধ ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলো, সেই দাবির ভিত্তি কোথায় ছিল?

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত এই প্রকল্পটি শ্যামনগরের উপকূলীয় জনপদকে নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Tags:

সম্পর্কিত খবর :