হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের উত্তর বরগ জামে মসজিদ নামকরণ নিয়ে বিরোধের জেরে প্রশাসনের লাগানো তালা প্রায় চার মাসেও খোলা হয়নি। ফলে মসজিদের নিয়মিত জামাত, জুমার নামাজ, হাফিজি মাদ্রাসার পাঠদানসহ সকল ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এতে এলাকার মুসল্লি, শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী ও ধর্মপ্রাণ মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মসজিদের নামকরণ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার জাহিদ বিন কাসেম গত ১৫ মার্চ ২৬ ইং তারিখৈ মসজিদ ও সংলগ্ন হাফিজি মাদ্রাসাসহ আশপাশের প্রায় ২০০ গজ এলাকায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি করেন। একইসঙ্গে মসজিদের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত পবিত্র রমজান মাসে ইতেকাফরত ১৭ জন মুসল্লিকেও প্রশাসনের নির্দেশে মসজিদ ত্যাগ করতে হয়। এরপর থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জুমার নামাজ ও মাদ্রাসার পাঠদান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, “মসজিদ নিয়ে আমাদের মধ্যে আর কোনো ঝামেলা নেই। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে নামাজ পড়তে চাই। কিন্তু উপজেলা প্রশাসন তালা খুলে দিচ্ছে না। এভাবে দীর্ঘদিন ইবাদত থেকে বঞ্চিত থাকা আমাদের জন্য কষ্টদায়ক।
ইতোমধ্যে স্থানীয় মুসল্লিদের পক্ষ থেকে এলাকাবাসীর গণস্বাক্ষরসহ জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদন দেওয়া হয়েছে। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মসজিদ খুলে ধর্মীয় কার্যক্রম চালুর অনুরোধ জানিয়ে আবেদনের অনুলিপি সংসদ সদস্য, পুলিশ সুপার, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, মাধবপুর থানা ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বর্তমান উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. মেহেদী হাসান বলেন, “ তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার একটি সালিশে বাদী পক্ষ ও বিবাদী পক্ষকে নিয়ে বসে এই সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়, যে বাদী ছোয়াব আলী বিবাদী পক্ষকে মসজিদ ছেড়ে দেওয়ার শর্তে ২০ লক্ষ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু সেই টাকা এখনো পরিশোধ করা হয়নি এবং বিরোধেরও স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাই আপাতত মসজিদের তালা খোলা যাচ্ছে না।”
বাংলাদেশ সংবিধানের ৪১ অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার স্বীকৃত। পাশাপাশি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা। এটি জরুরি পরিস্থিতিতে শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষায় জারি করা হয়, যা সাধারণত ২ মাসের বেশি বহাল রাখা যায় না। বিশেষ ক্ষেত্রে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তা বাড়াতে পারেন। তবে দীর্ঘমেয়াদে মসজিদের মতো উপাসনালয় বন্ধ রাখা নাগরিকের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।
ইসলামী শরীয়তে মসজিদ আল্লাহর ঘর। একে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়, যা বেচা-কেনা বা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরযোগ্য নয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে ঘর নির্মাণ করেন।” [বুখারি] বিরোধ থাকলে স্থানীয় সালিশ, ওয়াকফ প্রশাসন বা আদালতের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে, কিন্তু মুসল্লিদের ইবাদত থেকে বঞ্চিত করা শরীয়তসম্মত নয়।
স্থানীয় ইসলামি চিন্তাবিদরা বলছেন, “বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য আইনি প্রক্রিয়া চলতে পারে। কিন্তু তার অজুহাতে মাসের পর মাস আল্লাহর ঘর বন্ধ রাখা এবং শত শত মুসল্লিকে জামাত ও কোরআন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থায় নামাজ চালুর সুযোগ দিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা জরুরি।”
উল্লেখ্য, স্থানীয়দের দাবি- মসজিদের তালা রহস্যজনকভাবে কয়েকবার খুলে গেলেও প্রশাসনিকভাবে এখনো আনুষ্ঠানিক অনুমতি মেলেনি। এতে এলাকায় ক্ষোভ ও ধর্মীয় অসন্তোষ বাড়ছে











