একমাসে ১৬ খু’ন কুমিল্লায়, চরম নিরাপত্তাহীনতায় জেলাবাসী

একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডের কারণে কুমিল্লা আতঙ্কের জনপদ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে। কিশোর অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশের জোরদার অভিযানের মধ্যেই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে কিশোরী জান্নাত তাজমিন।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের ১০৫ কিলোমিটারে অপরাধীরা প্রবাসীদের লক্ষ্য করে ডাকাতি চালাচ্ছে। পুলিশি তৎপরতার মধ্যেও কৌশল পাল্টে নিরাপদে অপরাধীরা পাল্টা তৎপরতা চালাচ্ছে। ঘর থেকে বের হওয়ার পর কুমিল্লার সাধারণ মানুষের অনেকেই নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে কি না সেই শঙ্কা-আতঙ্কে থাকে। কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকার বাসিন্দা ডা. আকিব আব্দুল্লাহ পরিস্থিতি তুলে ধরে গতকাল কালের কণ্ঠকে বললেন, কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও নগরের টমছম ব্রিজ থেকে মেডিক্যাল রোড অংশ রাত ১২টার পর সাধারণ মানুষের জন্য আতঙ্কের।
 

কুমিল্লা জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা হয়েছে গতকাল রবিবার। সভায় উপস্থাপিত কার্যপত্র থেকে জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে কুমিল্লার বিভিন্ন থানায় ৩৭টি হত্যা মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে ১০, আগস্টে ১১ এবং সেপ্টেম্বরে ১৬টি মামলা মামলা করা হয়। এ ছাড়া জেলায় তিন মাসে বিভিন্ন অপরাধে এক হাজার ৭৪৫টি মামলা করা হয়েছে।

ডাকাতির ঘটনায় মামলা হয়েছে সাতটি। জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ মাসে কুমিল্লায় ১০৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। হত্যাকাণ্ডের বেশির ভাগই পারিবারিক, মাদক ও পরকীয়ার কারণে ঘটেছে। তার মধ্যে কিছু ঘটনায় কিশোর গ্যাংও জড়িত ছিল। 

জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের মাসিক আইন-শৃঙ্খলার কমিটির সভা শেষে গতকাল সকালে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী  বলেন, প্রতিটি অপরাধের বিষয়ে সভায় আলাদাভাবে আলোচনা হয়েছে।

সড়ক ও মহাসড়কের নিরাপত্তায় পুলিশ ও হাইওয়ে পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। যেভাবে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চলেছে তেমনি অন্যান্য অপরাধের বিষয়েও আলাদাভাবে অভিযানের পরিকল্পনা চলছে। 

অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে এখনো আলোচনায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার জন্য বাসা থেকে বের হয়। পরদিন সকালে অপ্রতিমের লাশ পাওয়া যায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গলে। পুলিশ বলছে, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নিতেই তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার ১২ ঘণ্টার মধ্যে পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে।

অপ্রতিম হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হয় সপ্তম শ্রেণির স্কুলছাত্রী জান্নাত তাজমিন। সে কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী ছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগতপুরের ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন দুপুরে পুলিশ অটোচালক সুমন মিয়াকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে। গত শনিবার সকালে পুলিশ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, জান্নাত তাজমিনকে হত্যার আগে গলায় গামছা পেঁচিয়ে অচেতন অবস্থায় ধর্ষণ করে সুমন। পরে তাকে শ্বাসরোধে হত্যা করে ধানক্ষেতের কাদাপানিতে ফেলে পালিয়ে যায়।

জানা গেছে, নিহত তাজমিনের বাড়ি যশোর জেলায়। বাবা আবদুল আলীম একটি ওষুধ কম্পানিতে চাকরি করেন। সেই সুবাদে মা-বাবার সঙ্গে কুমিল্লায় রেসকোর্সের ভাড়া বাসায় থাকত সে। গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় সে। পরে ৭ অক্টোবর রাত ২টা ৫৮ মিনিটে কক্সাবাজারের একটি বাস থেকে পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড এলাকার নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরির পর বাবার হোয়াটসঅ্যাপে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে খুদে বার্তায় লেখে—‘বাবা, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও’। তাৎক্ষণিক বাবা বার্তাটি দেখেননি। পরে তার লাশ পাওয়া যায়।

যেখানে-সেখানে ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। তাতে হত্যার শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী গত ২৫ এপ্রিল রাত ১টা ২৫ মিনিটে স্ত্রী ঊর্মি হীরাকে ফোনে জানিয়েছিলেন—‘ঘুমিয়ে পড়ো, আমার আসতে দেরি হবে।’ এটিই ছিল স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর শেষ কথা। এরপর বাসেই ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। ঘুম ভাঙার পর জানতে পারেন, তিনি কুমিল্লার পদুয়ার বাজার মোড় পার হয়ে আধাকিলোমিটার দূরে জাগুরঝুলি অতিক্রম করছেন। বাসচালকের সহকারী তাঁকে সেখানেই নামিয়ে দেন। পরে বুলেট বৈরাগী সিএনজি অটোরিকশায় উঠলে আগে থেকে ওত পেতে থাকা ছিনতাইকারীচক্রের কবলে পড়েন। অস্ত্রের মুখে জিম্মি ও মারধর করে নগদ অর্থ, মোবাইল ছিনিয়ে নিয়ে চলন্ত অটো থেকে তাঁকে মহাসড়কের পাশে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। পরদিন সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকায় তাঁর রক্তাক্ত মরদেহ পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় র‌্যাব ছয় ছিনতাইকারীকে ধরতে পেরেছিল।

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী ছাড়াও এর আগে মুরাদগরের যুবলীগ নেতা খায়রুল আলম সাধনসহ আরো অনেককে হত্যা করা হয়েছে।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের ১০৫ কিলোমিটারে অপরাধীরা নিরাপদে অপরাধ চালাচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ও কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের কুমিল্লা অংশে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্র। তারা চলন্ত গাড়িতে লোহার পাইপ ও ভারী বস্তু নিক্ষেপ করে গাড়ি থামিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে যাত্রীদের সর্বস্ব লুট করছে। তাদের মূল টার্গেট প্রবাসফেরত যাত্রীরা। গতকাল ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, মুখে গামছা বেঁধে যাত্রীবাহী গাড়ি লক্ষ্য করে অস্ত্র নিয়ে মহাসড়কের পাশে কয়েকটি গাড়িতে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। দেবীদ্বার থানার ওসি মনিরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, গত তিন মাসে দেবীদ্বার থানা এলাকায় কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত তিন মাসে নগরীতে শতাধিক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও থানায় কেউ মামলা না করায় ছিনতাই কোটায় শূন্য উল্লেখ করা হয়েছে। বিবরণীতে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, গত সেপ্টেম্বর মাসে কুমিল্লা জেলার ১৮টি থানায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে মোট এক হাজার ৬৫২ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে মুচলেকা নিয়ে অভিভাবকের জিম্মায় এক হাজার ১৩৯ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাকি ৫১৩ জনকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়।

কুমিল্লার রেসকোর্স এলাকার বাসিন্দা ডা. আকিব আব্দুল্লাহ বলেন, কুমিল্লা নগরের টমছম ব্রিজ থেকে মেডিক্যাল রোডে সম্প্রতি চার-পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে। কয়েক দিন আগে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চার শিক্ষার্থীকে মারধর করে মোবাইল ফোন ও মানিব্যাগ ছিনতাই করে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এর এক দিন পর টমছম ব্রিজ এলাকার মসজিদের সামনে অটো থেকে নামার পর কুমিল্লা সেন্ট্রাল মেডিক্যাল কলেজ সার্জারি বিভাগের সিএ মো. শহীদুল ইসলাম সুজনকে অস্ত্র দেখিয়ে তাঁর সঙ্গে থাকা টাকা-পয়সাসহ মোবাইল ফোন ছিনতাই করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। কুমিল্লা অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও জেল থেকে বের হয়ে অপরাধীরা আবার একই অপরাধ করছে।

কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ডা. মো. মোসলেহ উদ্দিন  বলেন, কুমিল্লায় একের পর এক হত্যাকাণ্ডে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বাসা থেকে বের হয়ে মানুষ নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় থাকে। হত্যা-ধর্ষণের শিকার হচ্ছে শিশুরাও। হত্যাকাণ্ড পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ছোট ছোট কারণে এসব ঘটনা ঘটছে।

কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) পংকজ বড়ুয়া  বলেন, ‘জেলায় আইন-শৃঙ্খলা যাতে স্বাভাবিক থাকে সে জন্য আমরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। কুমিল্লার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য প্রতিটি ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত আন্তরিকতা ও পেশাদারির সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনা সংঘটিত হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধী শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।’

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top