কোনো সংগঠনের কমিটি তখনই কার্যকর হয়, যখন সেখানে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়। শুধু পদ-পদবি দিয়ে একটি সাংগঠনিক কাঠামো দাঁড় করানো সম্ভব, কিন্তু সেই কাঠামোকে শক্তিশালী ও কার্যকর সংগঠনে রূপ দিতে প্রয়োজন যোগ্যতা, ত্যাগ, সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং সর্বোপরি কর্মীদের আস্থা।
একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি শুধু কমিটি, পদ-পদবি কিংবা সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর মূল শক্তি নিহিত থাকে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের আস্থা, অংশগ্রহণ ও সক্রিয়তায়। সেই আস্থা যখন ক্ষয় হতে শুরু করে, তখন যত বড় কমিটিই গঠন করা হোক না কেন, সংগঠনের ভিত শক্তিশালী হয় না।
মান্দা উপজেলা বিএনপির বর্তমান বাস্তবতায় তৃণমূলের প্রত্যাশাও তাই নতুন কোনো বিভাজন নয়; বরং দীর্ঘদিনের দূরত্ব ও অবিশ্বাস কাটিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ, যোগ্যতাভিত্তিক ও কর্মীবান্ধব বিএনপি গড়ে তোলা। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ডা. ইকরামুল বারী টিপুর নেতৃত্বের প্রতিই তৃণমূলের একটি অংশ সবচেয়ে বেশি আস্থা প্রকাশ করছে।
বর্তমান সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে শুরু থেকেই অনিয়ম, পক্ষপাত এবং ‘মাই ম্যান কমিটি’ গঠনের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও যোগ্যতা ও ত্যাগের চেয়ে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগও রয়েছে। ফলে দীর্ঘদিন দলের জন্য কাজ করা অনেক নেতাকর্মী প্রত্যাশিত মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তৃণমূলের একাংশ মনে করে।
অবশ্য এসব অভিযোগের সত্যতা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে এসব অভিযোগ যে সংগঠনের ভেতরে অসন্তোষ ও আস্থার সংকট তৈরি করেছে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
এ অবস্থায় প্রয়োজন শুধু কমিটি পরিবর্তন নয়; প্রয়োজন মূল্যায়নের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন। আগামী দিনের বিএনপিতে কে কার লোক, কে কার অনুসারী কিংবা কোন বলয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এসব যেন মূল্যায়নের মাপকাঠি না হয়। একজন নেতার পরিচয় নির্ধারিত হওয়া উচিত তাঁর যোগ্যতা, সততা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ত্যাগ ও জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে।
এই জায়গাতেই ডা. ইকরামুল বারী টিপুর নেতৃত্বের যৌক্তিকতা সামনে আসে। তাঁর সাংগঠনিক রাজনীতির ইতিহাস দীর্ঘ। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৩ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা শেষ করে এলাকায় ফিরে তিনি বিএনপির সংগঠন গোছানোর কাজে যুক্ত হন। ১৯৯৪ সালে তাঁর উদ্যোগে উপজেলা ছাত্রদলের প্রথম কমিটি এবং ১৯৯৫ সালে তাঁর নেতৃত্বে যুবদলের কমিটি গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং দুই দফায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।
অর্থাৎ মান্দায় বিএনপির সাংগঠনিক বিস্তারের প্রাথমিক পর্যায় থেকেই তাঁর রাজনৈতিক উত্থান ও সংগঠন গড়ে তোলার ভূমিকা জড়িয়ে আছে।
ছাত্র ও যুবকদের সংগঠিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংগঠন গড়ে তোলা এবং তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির রাজনৈতিক ভিত্তি বিস্তারে তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা তাঁকে নেতৃত্বের ক্ষেত্রে একটি আলাদা অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায় থেকে শুরু করে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক তাঁকে সংগঠনের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বোঝার বাড়তি সক্ষমতা দিয়েছে।
চিকিৎসক হিসেবেও মানুষের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পৃক্ততা তাঁর একটি স্বতন্ত্র সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছে। সর্বোপরি, জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ম্যান্ডেট তাঁর নেতৃত্বকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তৃণমূলের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পর্ক, চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততা এবং জনগণের ভোটে পাওয়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ম্যান্ডেট সবকিছু মিলিয়ে ডা. টিপু অন্যদের তুলনায় একটি বিশেষ অবস্থানে রয়েছেন।
তবে এই অবস্থান যেমন রাজনৈতিক শক্তি, তেমনি বড় ধরনের জবাবদিহিরও বিষয়। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁকেই সবচেয়ে বেশি মানুষের মুখোমুখি হতে হবে। সংগঠনে পক্ষপাত, অনিয়ম কিংবা যোগ্যতার অবমূল্যায়নের অভিযোগ উঠলে শেষ পর্যন্ত এর রাজনৈতিক দায়ও তাঁকেই বহন করতে হবে। ভবিষ্যতে তাঁকেই জনগণের কাছে যেতে হবে, তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে এবং তাঁদের ভোট চাইতে হবে।
সুতরাং নিরপেক্ষতা তাঁর জন্য শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, রাজনৈতিক প্রয়োজনও। যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করলে তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। বিপরীতে পক্ষপাতের অভিযোগ উঠলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ভিত্তি। ফলে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর স্বার্থও তাঁকে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলতে, স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করতে উৎসাহিত করবে।
তৃণমূলের প্রত্যাশা তাই কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের পুনর্বাসন নয়; বরং সবার ন্যায্য মূল্যায়ন। কে কার লোক—এটি যেন প্রশ্ন না হয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, কে দলের জন্য কতটা যোগ্য, সৎ, দক্ষ, ত্যাগী ও জনপ্রিয়।
মান্দার বিএনপির এখন প্রয়োজন ‘মাইনাস’ করার রাজনীতি নয়; প্রয়োজন ‘যোগ’ করার রাজনীতি। নিজের অনুসারীদের নিয়ে সংগঠন করা সহজ; কিন্তু ভিন্নমতের মানুষকেও আস্থায় নিয়ে একটি সংগঠনের পতাকাতলে দাঁড় করানোই বড় নেতৃত্বের পরিচয়।
ডা. টিপুর সামনে তাই শুধু নেতৃত্ব দেওয়ার নয়, একটি নতুন সাংগঠনিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠারও সুযোগ রয়েছে। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠন গড়ে তোলার দক্ষতা, তৃণমূলের সঙ্গে সম্পর্ক, মানুষের আস্থা এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে জবাবদিহি সবকিছু একত্রিত করতে পারলে মান্দা বিএনপিতে দীর্ঘদিনের দূরত্ব ও অবিশ্বাস কাটিয়ে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে।
তাই ডা. টিপুর প্রতি আস্থা কোনো ব্যক্তি বা পক্ষের প্রতি অন্ধ সমর্থন নয়; বরং এটি একটি ঐক্যবদ্ধ, যোগ্যতাভিত্তিক ও কর্মীবান্ধব বিএনপির প্রত্যাশা। মান্দার তৃণমূল এমন নেতৃত্বই চায় যে নেতৃত্ব কাউকে মাইনাস করে নয়, বরং যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করবে।



