কক্সবাজারে নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সম্প্রীতির পথে বাধা চিহ্নিত করল তরুণদের গবেষণা

কক্সবাজারে নারীর ক্ষমতায়ন, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার পথে বিভিন্ন বাধা চিহ্নিত করেছে তরুণদের পরিচালিত এক গবেষণা। গবেষণায় গুজব ও ভুল তথ্য, সরকারি সেবা গ্রহণে সীমাবদ্ধতা, নারীদের সামাজিক প্রতিবন্ধকতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে অসম অংশগ্রহণকে শান্তি প্রতিষ্ঠার অন্যতম চ্যালেঞ্জ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

রোববার (২৫ অক্টোবর) কক্সবাজার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘নারীবাদী গবেষণার নীতি অনুসরণে তরুণদের পরিচালিত অংশগ্রহণমূলক গবেষণা’ শীর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কক্সবাজারে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় নারীর ক্ষমতায়ন, তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

রিসার্চ ইনিশিয়েটিভস বাংলাদেশের (আরআইবি) কারিগরি সহায়তায় পরিচালিত এ গবেষণায় কক্সবাজার সদর, উখিয়া ও টেকনাফে তরুণদের নেতৃত্বে পাঁচটি অংশগ্রহণমূলক গবেষণা পরিচালনা করা হয়। এতে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সরকারের ভূমিকা, নারী-সংবেদনশীল সরকারি সেবা গ্রহণের প্রতিবন্ধকতা, শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারী ও কিশোরীদের অংশগ্রহণ, সংঘাত প্রতিরোধে আগাম সতর্কীকরণ এবং অনলাইনে ভুল তথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য মোকাবিলায় তরুণদের ভূমিকা পর্যালোচনা করা হয়।

গবেষণার সমন্বিত ফলাফল উপস্থাপন করে আরআইবির উপপরিচালক রুহি নাজ বলেন, গুজব, ভুল তথ্য, সরকারি সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার এবং অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অসম সুযোগ কমিউনিটির মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ, নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রাপ্তি, জনগণের প্রয়োজনের প্রতি সাড়া দেয় এমন স্থানীয় প্রতিষ্ঠান এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সুযোগ সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

নারী ও কিশোরীদের অংশগ্রহণে নানা বাধা

গবেষণায় নারী ও কিশোরীদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সামাজিক প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবারের বিধিনিষেধ, সামাজিক সমালোচনার ভয়, চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা এবং কমিউনিটির সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব রাখার সুযোগের অভাব।

এসব বাধা দূর করতে নারী ও কিশোরীদের জন্য নিরাপদ পরিসর তৈরি, তথ্য ও সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অংশগ্রহণ জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ফারিহা হোসেন বলেন, কমিউনিটির সমস্যা চিহ্নিত করা এবং বাস্তবসম্মত সমাধানে অবদান রাখার সক্ষমতা তরুণদের রয়েছে। নারী ও কিশোরীরা যখন নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখতে পারেন, তখন তরুণদের অংশগ্রহণ আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের সুপারিশ

অনুষ্ঠানে পাঁচটি গবেষক দলের তরুণ সদস্যরা নিজেদের গবেষণার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। গবেষণার ফলাফল কীভাবে কমিউনিটি পর্যায়ে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়েও আলোচনা হয়।

গবেষক দলের সুপারিশের মধ্যে রয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সংলাপ জোরদার, সরকারি সেবা সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর অংশগ্রহণে সহায়তা এবং দায়িত্বশীলভাবে তথ্য আদান-প্রদান উৎসাহিত করা।

নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সুশালা মহিলা সমিতির নির্বাহী পরিচালক শোমায়া কামাল বলেন, নারীর ক্ষমতায়ন শুধু সভায় অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। নারী ও কিশোরীদের নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ এবং জীবনকে প্রভাবিত করে এমন সিদ্ধান্তে ভূমিকা রাখার জন্য আত্মবিশ্বাস, নিরাপদ পরিসর ও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটি গঠনে তাদের নেতৃত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আলোচনায় অংশ নেওয়া এক সাংবাদিক বলেন, গুজব ও যাচাই না করা তথ্য কমিউনিটির মানুষের মধ্যে আস্থা নষ্ট করতে পারে এবং ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে পারে। এসব মোকাবিলায় তরুণ, সাংবাদিক ও কমিউনিটির নেতাদের একসঙ্গে কাজ করে তথ্য যাচাই এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ায় এমন ইতিবাচক তথ্য প্রচার করা প্রয়োজন।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্ক সম্ভাব্য উত্তেজনা আগেভাগে চিহ্নিত করা, যাচাই করা তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া এবং কমিউনিটির উদ্বেগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে যথাযথ প্রশিক্ষণ, সুস্পষ্ট দায়িত্ব বণ্টন, তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং নিরাপদে প্রয়োজনীয় সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সংযুক্ত করার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

গবেষণার সুপারিশে আরও রয়েছে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি, দায়িত্ব ও সময়সীমা নির্ধারণ, তরুণদের দলের সঙ্গে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের যোগাযোগ বৃদ্ধি, সরকারি সেবা-সংক্রান্ত তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করা এবং ভুল তথ্য ও কমিউনিটির উদীয়মান উদ্বেগ মোকাবিলায় নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

গবেষণাটি নির্বাচিত কিছু কমিউনিটিতে গুণগত পদ্ধতিতে পরিচালিত হওয়ায় এর ফলাফল কক্সবাজারের সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে স্থানীয় বাস্তবতার ভিত্তিতে পাওয়া এসব তথ্য ভবিষ্যৎ সংলাপ, জনস্বার্থে নীতিগত উদ্যোগ এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমে সহায়ক হতে পারে।

উল্লেখ্য, অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ সামাজিক ন্যায়বিচার, জেন্ডার সমতা ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আগমনের পর থেকে সংস্থাটি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করছে। মানবিক চাহিদা মোকাবিলা, কমিউনিটির সক্ষমতা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করা সংস্থাটির অন্যতম লক্ষ্য।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top