কালীগঞ্জে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শিক্ষককে মারধর ও অবরুদ্ধ, হাসপাতালে ভর্তি: অভিযোগপত্র নিয়ে রহস্য
নূর উন নবী – মর্নিং পোস্ট প্রতিনিধি > ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে শাহ আলম নামের এক সহকারী শিক্ষককে মারধরের পর প্রায় ৬ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে স্থানীয়রা। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে থানা হেফাজতে নেয়। সেখানে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং পরে জরুরি চিকিৎসার জন্য ঝিনাইদহ সদর হাসপাতালে পাঠায় কালীগঞ্জ থানা পুলিশ। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে উপজেলার বড় বাইসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে। চাঞ্চল্যকর এ ঘটনায় জেলা জুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ স্কুল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার এক সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ তোলেন অভিভাবকরা। ছাত্রীর পরিবারের দাবি, সহকারী শিক্ষক শাহ আলম গত দুই সপ্তাহ ধরে তাকে দুপুরে খাওয়ার জন্য ১০ টাকা করে দিতেন এবং ঘটনার দিন নিজের হাতে ‘ওয়াশরুমে যাও’ লিখে দেখান। এতে ভয় পেয়ে ছাত্রীটি বাড়িতে চলে যায় এবং পরিবারের কাছে অভিযোগ করে।
পরদিন মঙ্গলবার সকালে প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ছাত্রীর বাড়িতে যান এবং সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিয়ে বিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। তবে অফিসে প্রবেশের দু-চার মিনিটের মধ্যেই ছাত্রীর স্বজনসহ ১০–১২ জন বহিরাগত স্কুলে ঢুকে শিক্ষক শাহ আলমকে বেধড়ক মারধর করে। শিক্ষকরা তাকে উদ্ধার করে অফিস কক্ষে নিয়ে গেলে হামলাকারীরা স্কুলের সামনে অবস্থান নিয়ে দফায় দফায় হামলার চেষ্টা চালায়।
রহস্যজনক অভিযোগপত্র ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া ঘটনার পর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও প্রধান শিক্ষকের কাছে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে একটি হাতে লেখা অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। তবে চিঠিটিতে কোনো স্বাক্ষর ছিল না এবং আবেদনটি কার বরাবর দেওয়া হয়েছে তাও উল্লেখ ছিল না।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীর পক্ষে এমন শব্দচয়ন ও বর্ণবিন্যাসে চিঠি লেখা সম্ভব কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ জেলার সচেতন মহলে ব্যাপক বিতর্ক ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সুখদেব বিশ্বাস দাবি করেন, তিনি শুনেছেন ছাত্রীকে ওয়াশরুমে নিয়ে গায়ে হাত দেওয়া হয়েছে। তবে ছাত্রীর লিখিত বয়ানে ওয়াশরুমে যাওয়ার কোনো ঘটনার উল্লেখ না থাকায় সভাপতির বক্তব্য নিয়ে তৈরি হয়েছে অস্পষ্টতা।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
- অভিযুক্ত শিক্ষক শাহ আলম: “আমি ষড়যন্ত্রের শিকার। শিক্ষার্থীদের সাথে আমার স্নেহপূর্ণ সম্পর্ক। আমি কিভাবে শিক্ষার্থীদের সাথে আপত্তিকর আচরণ করব, এটাই ভেবে পাচ্ছি না। কেউ আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ করবে তা ভাবতেও পারিনি।”
- প্রধান শিক্ষক পিয়ার মোহাম্মদ: “শাহ আলম পিটিআই ট্রেনিং শেষ করে মাত্র তিন মাস হলো বিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে এর আগে কোনো শিক্ষার্থী এমন অভিযোগ করেনি। এ ঘটনায় আমরা সবাই হতবাক।”
- কালীগঞ্জ থানার ওসি কবির হোসেন: “খবর পেয়ে শিক্ষককে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে থানায় আনা হয়। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে উন্নত চিকিৎসার জন্য সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার প্রস্তুতি চলছে।”
- কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ: “ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেনেছি ১০/১২ জন মিলে শিক্ষককে মারধর করেছে। নিপীড়নের যে অভিযোগটি উঠেছে, তা পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”




