গাইবান্ধা সদর থানায় এজাহার দাখিল করতে গিয়ে বিচারহীনতার শিকার হয়ে এক নারী আত্মহত্যাচেষ্টা চালিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ওই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুনের বিরুদ্ধে এজাহার না নিয়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ এনে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
সোমবার (৯ মার্চ) গাইবান্ধা সদর উপজেলার উজির ধরনীবাড়ী এলাকার বাসিন্দা এএইচএম জিয়াউর রহমান খান ডাকযোগে পুলিশ সদর দপ্তরে এই অভিযোগপত্র পাঠান। অভিযোগের অনুলিপি গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) ও রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির কাছেও প্রেরণ করা হয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে জিয়াউর রহমান খানের বাড়ির কেয়ারটেকার ও একই এলাকার বাসিন্দা মোছাঃ নূরুন নাহার স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির হাতে শারীরিক নির্যাতন, মারধর, শ্লীলতাহানি এবং জোরপূর্বক আটকে রাখার শিকার হন। ঘটনার পর ন্যায়বিচার পেতে ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভুক্তভোগী গাইবান্ধা সদর থানায় গিয়ে লিখিত এজাহার দাখিল করতে চান।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, থানায় গেলে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাকে স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করার পরামর্শ দেন এবং এজাহার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান। অথচ ফৌজদারি কার্যবিধির (সিআরপিসি) ১৫৪ ধারা অনুযায়ী জ্ঞাত অপরাধের অভিযোগ পেলে তা এজাহার হিসেবে গ্রহণ করা থানার জন্য বাধ্যতামূলক।
আইনি প্রতিকার না পাওয়ায় ভুক্তভোগী চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন। অভিযোগে বলা হয়, স্থানীয়ভাবে একটি সালিশ বৈঠকের আয়োজন করা হলেও সেখানে তিনি কোনো ন্যায়সঙ্গত প্রতিকার পাননি। সামাজিক চাপ, হতাশা এবং ন্যায়বিচার না পাওয়ার বেদনা থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ওই নারী বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গুরুতর অবস্থায় তাকে দ্রুত স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। বর্তমানে তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছেন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সময়মতো চিকিৎসা না পেলে তার জীবনহানির আশঙ্কা ছিল।
ঘটনার পর ন্যায়বিচারের দাবিতে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে গাইবান্ধা প্রেসক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ঘটনা তুলে ধরে ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং এজাহার গ্রহণ করে আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, “একজন নারী শারীরিক নির্যাতন ও শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে থানায় এজাহার দিতে গেলে ওসি তা গ্রহণ না করে মীমাংসার পরামর্শ দেন। এটা আইনের চরম লঙ্ঘন। আমরা আইজিপি মহোদয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
অভিযোগকারী এএইচএম জিয়াউর রহমান খান বলেন, “আমাদের কেয়ারটেকার নূরুন নাহার গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। থানায় গিয়ে এজাহার দিতে চাইলে ওসি সাহেব তা নেননি, বরং স্থানীয়ভাবে মীমাংসা করতে বলেছেন। আইন তার হাতে তুলে দেওয়া দায়িত্ব তিনি পালন করেননি। এর ফলাফল ভুক্তভোগীকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দেয়।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বিশ্বাস করি প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করবে এবং ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পাবেন। আইজিপি মহোদয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করছি। আমরা সুষ্ঠু তদন্ত করে আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ওসির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা দাবি করছি।”
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “ঘটনাটি আমরা তদন্ত করে দেখেছি, অভিযোগের তেমন কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। পরে স্থানীয় চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে। ৫২ জনের স্বাক্ষরযুক্ত একটি মীমাংসা পত্র আমার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তবে সেই মীমাংসা পত্রে এএইচএম জিয়াউর রহমান খানের স্বাক্ষর রয়েছে কি না- এ বিষয়ে আমার জানা নেই।”
ঘটনাটি গাইবান্ধা সদর উপজেলার উজির ধরনীবাড়ী এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল মজিদ বলেন, “আমরা এলাকায় এমন ঘটনা আগে কখনও দেখিনি। একজন নারী নির্যাতনের শিকার হয়ে থানায় গিয়েছিলেন, সেখানে তিনি বিচার না পেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন—এটা খুবই লজ্জাজনক।”
অন্য এক বাসিন্দা রেবেকা সুলতানা বলেন, “থানা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জায়গা। সেখানে যদি বিচার না পান, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? আমরা প্রশাসনের কাছে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।”
এখন পর্যন্ত গাইবান্ধা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বিষয়টিতে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইজিপির কাছে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি তারা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং তারা জেলা পুলিশের কাছে প্রতিবেদন চেয়ে পাঠিয়েছেন।












