গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিকের মৃত্যু, ‘মানবিক’ কারণে সেই কিশোরের জামিন

রাজধানীর বারিধারায় গাড়িচাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান নিহতের ঘটনায় আযান আলী নামে ১৭ বছর বয়সী সেই কিশোরকে জামিন দিয়েছেন আদালত। ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় তার চিকিৎসা এবং শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষার স্বার্থে সম্পূর্ণ মানবিক বিবেচনায় জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ঢাকার শিশু আদালত-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির শুনানি শেষে দুই হাজার টাকা মুচলেকায় তার জামিন মঞ্জুর করেন।

এর আগে গত ৪ অক্টোবর ওই কিশোরের জামিন আবেদন নাকচ করেছিলেন আদালত। তখন আদালত পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, ‘এ ঘটনায় সে দ্রুততম সময়ে বের হয়ে গেলে সমাজের জন্য নেগেটিভ মেসেজ যাবে।’ ওই পর্যবেক্ষণের ২৫ দিন পর গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও শিক্ষাজীবনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাকে জামিন দেওয়া হলো।

আদালতে কিশোরের পক্ষে জামিন আবেদন করেন আইনজীবী খোরশেদ মিয়া আলম। শুনানিতে তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ৬০ থেকে ৭০ জনের একটি উত্তেজিত জনতা কিশোরটির ওপর হামলা চালিয়ে বেধড়ক মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে আটক করা হলেও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

এই আইনজীবী আদালতকে জানান, আটক হওয়ার পর কিশোরটির শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। তাকে গাজীপুরের টঙ্গীতে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা তার তীব্র জ্বর, বমি ও ডায়রিয়ার বিষয়টি শনাক্ত করেন। চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ও মাথায় গুরুতর আঘাতের তথ্যও উঠে এসেছে বলে জানান তিনি।

খোরশেদ মিয়া আলম আরও দাবি করেন, কিশোরটি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। মাথায় গুরুতর আঘাতের কারণে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ও রক্ত জমাট বাঁধার জটিলতা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা নিয়েও ঝুঁকি রয়েছে। এসব বিষয় তুলে ধরে গত ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে আটক থাকা কিশোরটির যেকোনো শর্তে জামিন চান তিনি।

তবে জামিন আবেদনের বিরোধিতা করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শরীফ উদ্দিন মামুন। শুনানি শেষে বিচারক উভয়পক্ষের বক্তব্য, জামিন আবেদন এবং শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে পাঠানো স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতিবেদনসহ নথিপত্র পর্যালোচনা করেন।

আদালতের পর্যালোচনায় উঠে আসে, গত ১৮ অক্টোবর কিশোরটির তীব্র জ্বর ও অতিরিক্ত বমি শুরু হলে প্রথমে তাকে টঙ্গীর শহীদ আহসান উল্লাহ জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে তার চিকিৎসা চলছে এবং পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।

চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে তার অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, মাথায় আঘাত ও মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত জটিলতার তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া শ্রবণশক্তি হারানোর বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। কিডনি ও যকৃতের কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর জটিলতার আশঙ্কার কথাও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

আদালতের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৬ ও ২৭ অক্টোবর করা রক্তের পূর্ণাঙ্গ গণনা পরীক্ষায় (সিবিসি) কিশোরটির প্লাটিলেটের সংখ্যা যথাক্রমে ৮৬ হাজার ও ৯০ হাজার পাওয়া যায়।

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিশোরটির বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় বিশেষায়িত চিকিৎসা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যা প্রয়োজন। কিন্তু টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৩০০ জন হলেও সেখানে বর্তমানে ১ হাজার ১৯ জন শিশু রয়েছে। জনবল, অবকাঠামো ও পরিচর্যার সীমাবদ্ধতার কারণে কিশোরটির প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা নিশ্চিত করা কঠিন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জামিন আদেশে যা বললেন আদালত

জামিন আদেশে বিচারক উল্লেখ করেন, বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মেহেদী হাসান মিমকে চাপা দিয়ে প্রাণহানির অভিযোগে ১৭ বছর বয়সী শিশুকে আটক করা হয়েছে। শিশু আইন, ২০১৩-এর ৩৪ ধারার বিধান অনুযায়ী, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ তিন বছর মেয়াদে আটকাদেশ দেওয়ার বিধান রয়েছে।

আদেশে আরও বলা হয়, কিশোরটি এক মাস পাঁচ দিন ধরে আটক রয়েছে। শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তার বর্তমান জটিল শারীরিক অবস্থায় বিশেষায়িত চিকিৎসা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও সার্বক্ষণিক পরিচর্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রত্যয়ন অনুযায়ী, তার শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করাও প্রয়োজন।

এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ চিকিৎসা ও শিক্ষাজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থের কথা বিবেচনা করে সম্পূর্ণ মানবিক কারণে জামিন মঞ্জুর করা হয়েছে। দুই হাজার টাকা মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে আদেশে উল্লেখ করেন বিচারক।

গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকাল ৫টার দিকে রাজধানীর বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক জোনের ১ নম্বর সড়কের ফুটপাতে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নেওয়ার সময় দ্রুতগতির একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসানকে চাপা দেয়। পরে তাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসক।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজন গাড়িটির চালকের আসনে থাকা কিশোরটিকে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ওই রাতেই তাকে চাচার জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় মেহেদী হাসানের ভাই মোক্তাদীর ইসলাম গত ২৩ সেপ্টেম্বর গুলশান থানায় মামলা করেন।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top