ছাত্রলীগ নেতার হাত-পায়ের রগ কর্তন মামলার তদন্তে ডিবি, ভুক্তভোগী–আসামি সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য

মানিকগঞ্জে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের জেলা উপ-কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক বশির উদ্দিনের হাত–পায়ের রগ কর্তনের ঘটনায় করা মামলাটি তদন্ত করছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। মামলার এজাহারনামীয় আসামিরা গ্রেপ্তার না হলেও এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে সংশোধনাগারে পাঠানো হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা বশির (২১) ও তার ওপর হামলাকারীদের গ্রামে গিয়ে স্বজন ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্য বিস্তার ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে পরিবারের দাবি, একটি দোকানের টাকা চুরির ঘটনায় বন্ধু আকাশ মোল্লার (২৩) জামিনদার হয়েছিল বশির। সম্প্রতি ওই টাকার জন্য আকাশকে চাপ দেওয়ায় এই হামলা ঘটে।

আজ দুপুরে সদর উপজেলার বাজু গ্রামে বশিরদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে তার দাদি মনোয়ারা বেগম ও নানী ময়জান বেগম ছাড়া কেউ নেই।

ময়জান বেগম বলেন, ঘটনার দিন তার নাতি বশির তাদের বাড়ি সদর উপজেলার চরগোবিন্দপুর গ্রামে ছিল। বিকেলে ফুটবল খেলে রাত ৮টার দিকে বাড়িতে ফেরে। এরপর মোবাইলে ফোন দিয়ে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। পরে রাতে খবর আসে, তাকে কুপিয়ে আহত করা হয়েছে।

বশিরের চাচা বেতিলা মিতরা ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি আইজুদ্দিন বলেন, ‘বশির যে ছাত্রলীগ করে তা আগে জানতাম না। কয়েক দিন আগেও সে আমাদের সাথে বিএনপির মিছিল করেছে। তাকে যে ডেকে নিয়ে মারছে তার মধ্যে আকাশ এলাকায় কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করে। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা আছে। এ ছাড়া অন্য আসামিরাও এলাকায় সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত। তবে বশিরকে রাজনৈতিক কারণে মারা হয়নি। নিজেদের আধিপত্য নিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে।’

সদর উপজেলার পশ্চিম গুজুরি গ্রামে আকাশদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার বাবা জুয়েল মোল্লা কিডনিরোগে ভুগছেন। তিনি বাড়ি থেকে খুব একটা বের হন না। জুয়েল মোল্লা বলেন, তার ছেলে আকাশ ও বশির ঘনিষ্ট বন্ধু। দুজনই এলাকায় খারাপ ছেলে হিসেবে পরিচিত।

আকাশের মা শিপন আক্তার বলেন, ‘আমার এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলেকে দিয়ে পড়াশুনা হয়নি। বখাটে হওয়ার কারণে তার অত্যাচারে আমরাও অতিষ্ঠ। দুই বছরে সে চার বিয়ে করেছে। কোনো বিয়েতে আমাদের সম্মতি ছিলো না। ছেলে খারাপ হওয়ার কারণে ৪/৫ মাস আগে ছেলেকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। সে এখন কোথায় আছে তা জানি না।’

আকাশের প্রতিবেশী শুকুর মিয়া বলেন, ‘আকাশ ইটখোলায় কাজে গিয়ে শ্রমিকদের মোবাইল চুরি করেছিল। এ ঘটনায় তার পরিবারের সম্মতিতে ঝামেলা মিটাতে এক লাখ টাকা ধার দেওয়া হয়। কিন্ত সেই টাকা ফেরত  না দেওয়ার ঘটনায় আমি মামলাও করেছি।’

পালড়া গ্রামের কবির হোসেন বলেন, বশির, আকাশ, আরিফ, তানজিদ, তহিনসহ ২০/২৫ জনের একটি কিশোর গ্যাং রয়েছে এলাকায়। গত কোরবানির ঈদের পরের দিন সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর কুমের পাড়ে এই কিশোর গ্যায়ের সদস্যরা আধিপত্য বিস্তার করে এবং স্থানীয় নারীদের কটূক্তি করে। ওই দিন স্থানীয় লোকজন কিশোর গ্যাংকে ধাওয়া করে ও তাদের কয়েকটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয়। এরা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বশিরকে যারা মেরেছে তারা তার ঘনিষ্ট বন্ধু। হয়তো মাদকের কোনো টাকা পয়সা অথবা এলাকায় আধিপত্য নিয়ে এই ঘটনা ঘটেছে।

মামলার অন্য আসামিদের মধ্যে আরিফ, তানজিদ ও তুহিন সম্পর্কে স্থানীয় লোকজন জানান, তারা মূলত কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। তাদের কর্মকান্ডে এলাকার মানুষজন সারাক্ষণ ভয়ে থাকে। এরা মাদক সেবন ও ব্যবসার সাথেও জড়িত।

বশিরের ভাই রবিউল ইসলাম জানান, মামলার আসামি আকাশকে সিংগাইরের একটি মুদি দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ দিয়েছিল বশির। কয়েক মাস কাজ করার পর আকাশ ওই দোকান থেকে পাঁচ লাখ টাকার মালামাল চুরি করে। এ ঘটনায় দোকানের মালিক বশিরকে টাকার জন্য চাপ দেয়। বশির টাকার জন্য আকাশকে চাপ দেয়। এ নিয়ে দুজনের সম্পর্কের অবনতি হয়। রোববার রাতে টাকা দেওয়ার কথা বলে বশিরকে ডেকে নিয়ে যায় আকাশ। এরপর আকাশের নেতৃত্বে আসামিরা বশিরকে হত্যার উদ্দেশ্যে রগ কাটাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে।

মানিকগঞ্জ ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মানবেন্দ্র বালো সমকালকে বলেন, বশিরকে রগ কেটে দেওয়ার ঘটনায় সিংগাইর থানায় মামলা হয়। ওই মামলাটি ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে। সোমবার রাতেই সদর উপজেলার অরংগবাদ গ্রাম থেকে এক কিশোরকে গ্রেপ্তার করা হয়। আজ আদালত তাকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর তাকে গাজীপুরের টঙ্গীর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র (বালক) পাঠানো হয়।

মানবেন্দ্র বালো বলেন, ‘প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে ভুক্তভোগীসহ মামলার আসামিদের সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য। নিজেদের মধ্যে আধিপত্তর বিস্তার ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এই রগকাটার ঘটনা ঘটেছে। কয়েক মাস আগে সদর উপজেলা কৃষ্ণপুর গ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের একটি ঘটনা ঘটেছিলো। এই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরাই স্থানীয় মেয়েদের উত্যাক্ত করেছিল। ওই ঘটনায় একটি মামলা হয়। এতে এই কিশোর গ্যাংয়ের  সদস্য আসামি।’

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

ছাত্রলীগ নেতার হাত-পায়ের রগ কর্তন মামলার তদন্তে ডিবি, ভুক্তভোগী–আসামি সবাই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য

মানিকগঞ্জে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের জেলা উপ-কর্মসংস্থান বিষয়ক সম্পাদক বশির উদ্দিনের

Scroll to Top