১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ ছিল স্বাধীনতার আন্দোলন, প্রতিরোধ ও সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত সশস্ত্র পর্যায় শুরু হওয়ার আগেই এখানকার ছাত্র-জনতা স্বাধীনতার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের ১০ মার্চ দেবীগঞ্জে প্রথমবারের মতো স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। পরে দীর্ঘ প্রতিরোধ ও যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৯ ডিসেম্বর দেবীগঞ্জ হানাদারমুক্ত হয়।
স্থানীয় ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১০ মার্চ ১৯৭১ সকাল আনুমানিক ১০টা থেকে ১১টার দিকে দেবীগঞ্জ ভূমি অফিসের সামনে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে তা পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। একই সময়ে দেবীগঞ্জ বাজার এলাকাতেও স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়। পতাকা উত্তোলনের সেই গৌরবময় মুহূর্তে বাজার দিয়ে চলাচলকারী বাঙালিরাও পতাকার সম্মানে দাঁড়িয়ে যান।
দেবীগঞ্জে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকার স্কেচ তৈরি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে আব্দুল লতিফ মাস্টারের ভূমিকার কথা স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। পতাকা উত্তোলনে অংশ নেন আব্দুল লতিফ, আ.কা.ম. মনিরুল ইসলাম, আনোয়ারুল হক বাবুল, স্বদেশ চন্দ্র রায়, ডা. রাহিমুল ইসলাম, রবিউল আলম, মঞ্জুরুল হক রেজু, মোহাম্মদ হুসেন (বাবুয়া)সহ অনেকে।
১০ মার্চের এ ঘটনা ছিল দেবীগঞ্জে পাকিস্তানি রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতীকী কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে প্রকাশ্য অবস্থান নেওয়ার একটি তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত। পরবর্তীতে ২৩ মার্চ দেশব্যাপী স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির অংশ হিসেবেও দেবীগঞ্জে পতাকা উত্তোলন করা হয়। তবে ১০ মার্চের প্রথম পতাকা উত্তোলনের ঘটনা এবং ২৩ মার্চের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল পৃথক ঘটনা।
দেবীগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্বে স্থানীয় রাজনৈতিক, ছাত্র ও সামাজিক সংগঠকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। স্বাধীনতার আন্দোলনকে সংগঠিত করা, ছাত্র-যুবকদের ঐক্যবদ্ধ করা, সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের প্রস্তুতিতে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয়ভাবে উল্লেখযোগ্য সংগঠকদের মধ্যে ছিলেন শফিউল আলম সাবদার, এ কে ভূইয়া, নূরুল হক প্রধান, লুৎফর রহমান, মঞ্জুরুল ইসলাম রেনু, আব্দুল লতিফ, ডা. রাহিমুল ইসলাম, স্বদেশ চন্দ্র রায়, আ.কা.ম. মনিরুল ইসলাম, এনামুল হক ও আনোয়ারুল হকসহ অনেকে।
দেবীগঞ্জে সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন নূরুল হক প্রধান ও লুৎফর রহমান। তাঁদের নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিকে স্বাধীনতার আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। অন্যদিকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন স্বদেশ চন্দ্র রায়, আব্দুল মজিদ, শফিউল আলম সাবদার ও আব্দুল মালেক চিশতি। ছাত্র ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও আ.কা.ম. মনিরুল ইসলাম, আনোয়ারুল হক বাবুল ও এনামুল হকসহ অনেকে সক্রিয় ছিলেন।
শফিউল আলম সাবদার ছিলেন ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক। এ কে ভূইয়াও মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি ও স্থানীয় প্রতিরোধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মঞ্জুরুল ইসলাম রেনু, আব্দুল লতিফ ও ডা. রাহিমুল ইসলামসহ অন্য সংগঠকরাও স্বাধীনতার আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
স্বদেশ চন্দ্র রায় দেবীগঞ্জের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সের (বিএলএফ) কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর গণহত্যা শুরু করার পর দেবীগঞ্জের আন্দোলন দ্রুত সশস্ত্র প্রতিরোধের দিকে এগিয়ে যায়। ছাত্র-যুবকদের অস্ত্র প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। তৎকালীন দেবীগঞ্জ থানার ওসি আব্দুল কাদের এ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাঙালি ইপিআর ও মুজাহিদ সদস্যরাও প্রশিক্ষণ ও প্রতিরোধ কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন।
পাকিস্তানি বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকাতে বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়। পাকিস্তানি বাহিনী দেবীগঞ্জে প্রবেশ করলে স্থানীয় নেতা-কর্মী ও সংগঠকদের অনেকে আত্মগোপনে গিয়ে পুনরায় সংগঠিত হন। সীমান্তবর্তী প্রশিক্ষণকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা হয়। আনসার, মুজাহিদ, ইপিআর সদস্য এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্থানীয় সাধারণ মানুষও প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন।
৯ ডিসেম্বর দেবীগঞ্জ হানাদারমুক্ত
ডিসেম্বরের শুরুতে দেবীগঞ্জে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা দেবীগঞ্জ সদরকে ঘিরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অবস্থান নেন। করতোয়া নদীর পশ্চিম পাড়, ভাজনী ও গোপাল বৈরাগী ঘাট এলাকাসহ তিন দিক থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে ঘেরাও করে রাখা হয়।
স্থানীয় বর্ণনা অনুযায়ী, ৯ ডিসেম্বর ১৯৭১ সেক্টর কমান্ডার এ কে ভূইয়ার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তুমুল লড়াই করেন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পাকিস্তানি সেনারা ভোর আনুমানিক ৬টার দিকে দেবীগঞ্জ থেকে ডোমার হয়ে সৈয়দপুরের দিকে পালিয়ে যায়। এর মধ্য দিয়ে দেবীগঞ্জ হানাদারমুক্ত হয়।
সেদিন বিকেল ৪টার দিকে দেবীগঞ্জ আনসার-ভিডিপি কার্যালয়ের সামনে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দেবীগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিউল আলম প্রধান পতাকা উত্তোলন করে দেবীগঞ্জকে আনুষ্ঠানিকভাবে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করেন।
এর আগে ৮ ডিসেম্বর বিজয় মিছিলের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর মর্টার শেল নিক্ষেপে দেবীগঞ্জ কৃষিফার্মের কর্মচারী নশু মিয়া শহীদ হন বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
দেবীগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১০ মার্চ থেকে ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়টি ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা থেকে সশস্ত্র বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক গৌরবময় অধ্যায়। ১০ মার্চ পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে যে প্রকাশ্য স্বাধীনতার ঘোষণা শুরু হয়েছিল, দীর্ঘ নয় মাসের সংগ্রাম ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ৯ ডিসেম্বর তা হানাদারমুক্ত দেবীগঞ্জে বিজয়ের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। এই ইতিহাসে সম্মুখযোদ্ধাদের পাশাপাশি রাজনৈতিক, ছাত্র ও সামাজিক সংগঠকদের অবদানও গভীরভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।



