নওগাঁয় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রায়ের অপেক্ষায় থাকা একটি স্পর্শকাতর মামলার গুরুত্বপূর্ণ নথি চুরি এবং তা ফেরতের বিনিময়ে চাঁদা দাবির চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। তবে চোর চক্রের শেষ রক্ষা হয়নি। নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের সরাসরি তত্ত্বাবধানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এক ঝটিকা অভিযানে চুরির মূল হোতাসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে চুরি হয়ে যাওয়া সেই গুরুত্বপূর্ণ মামলার মূল নথি।
গ্রেফতারকৃতরা হলেন নওগাঁ সদর উপজেলার সিংবাচা গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে এস এম আকাশ (২৬), যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২ এর পিয়ন পলাশ, তার ভাই সাপাহার সাব-জজ আদালতের পিয়ন আরিফ এবং কোর্টের মুহুরী সবুজ (৪০)।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ মে সন্ধ্যায় নওগাঁর সম্মানিত জেলা ও দায়রা জজ মহোদয় পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামকে জরুরি ভিত্তিতে জানান যে, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২ থেকে রায়ের অপেক্ষায় থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথি গায়েব হয়ে গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, দায়রা মামলা নম্বর- ৯০৪/২০২২ এর রায় ঘোষণা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু রায় প্রকাশের ঠিক আগেই পরিকল্পিতভাবে নথিটি সরিয়ে ফেলা হয়। শুধু তাই নয়, নথি চুরির পর একটি অজ্ঞাত নম্বর থেকে আদালতের কর্মচারীর কাছে ফোন করে ফাইলটি ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে নেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম। তিনি কালক্ষেপণ না করে জেলা গোয়েন্দা শাখাকে (ডিবি) দ্রুত চোর শনাক্ত, গ্রেফতার এবং নথি উদ্ধারের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেন। এসপির কড়া নির্দেশনায় মাঠে নামে ডিবির একটি চৌকস টিম।
ডিবি পুলিশ তথ্য-প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং ঘটনার চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মূল হোতাকে শনাক্ত করে। প্রথমে রাজশাহীর বাগমারা এবং পরে নওগাঁ সদরের শৈলগাছি ইউনিয়নের সিংবাচা বাজার এলাকায় ঝটিকা অভিযান চালিয়ে মূল আসামি এস এম আকাশকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারের পর আকাশকে ডিবি কার্যালয়ে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। একপর্যায়ে সে চুরির কথা স্বীকার করে এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গভীর রাতে তার বাড়ির আঙিনায় অভিযান চালানো হয়। সেখানে উপস্থিত জনসাধারণের সামনে আসামির দেখিয়ে দেওয়া খড়ের পালা (গাদা) থেকে অক্ষত অবস্থায় আদালতের সেই গুরুত্বপূর্ণ মামলার নথিটি উদ্ধার করে ডিবি পুলিশ।
আসামি আকাশের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি ও তথ্যের ভিত্তিতে ডিবির টিম রাতেই নওগাঁ সদর ও বগুড়ার আদমদিঘী এলাকায় চিরুনি অভিযান চালায়। এ সময় এই জঘন্য চক্রের সাথে জড়িত থাকার অপরাধে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালত-২ এর পিয়ন পলাশ, তার ভাই ও সাপাহার সাব-জজ আদালতের পিয়ন আরিফ এবং আদালতের মুহুরী সবুজকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
গ্রেফতারকৃত এস এম আকাশ বিজ্ঞ আদালতে ঘটনার সাথে নিজের প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে এবং এই চক্রের সাথে জড়িত অন্য তিনজনের নামসহ আরও বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, আদালতের পবিত্রতা ও বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এই অপচেষ্টা রুখে দেওয়া হয়েছে। এই চক্রের পেছনে আর কারা জড়িত আছে এবং এর মূল উদ্দেশ্য কী ছিল, তা পুরোপুরি উদঘাটন করতে পুলিশি তদন্ত জোরদারভাবে অব্যাহত রয়েছে। অপরাধী যেই হোক, কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।












