জয়পুরহাটে নন রেসিডেন্ট বাংলাদেশ কমার্শিয়াল ব্যাংক (এনআরবিসি) ক্ষেতলাল শাখায় তিন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে টেন্ডার জামানতের টাকা নিয়ে নকল পেঅর্ডার দিয়ে মোটা অংকের অর্থ আত্মসাথের অভিযোগ উঠেছে শাখা ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে।
সেই সাথে ঠিকাদারদের নিজ একাউন্টে থাকা টাকা ব্যবস্থাপক নিজেই তার স্বাক্ষরিত চেক দিয়ে উত্তোলণ করেছে। আবার ঋণ দেওয়ার কথা বলে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা ঠিকাদারদের একাউন্টে জমা নিয়ে ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩১০ টাকার নকল পেঅর্ডার দিয়েছেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, কাজের সময় পার হওয়ায় পেঅর্ডারগুলো কর্তৃপক্ষ অবমুক্তি করে দিলে তা ভাঙ্গাতে গেলে নকল বলে জানান বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক।
ঠিকাদারদের একাউন্টে জমাকৃত অর্থ সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মো. আহসান হাবীব তার নিজ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মেসার্স ফকির কর্পোরেশনের হিসাবে স্থানান্তর করেছেন বলেও অভিযোগ ওঠেছে।
অভিযোগ ও নথিপত্র যাচাই করে জানা যায়, ২০২৫ সালের মে মাসে কালাই পৌরসভার উন্নয়নকাজে অনলাইনে (ইজিবি) টেন্ডার আহবান করা হয়। কাজ পেতে অনলাইনেই টেন্ডার সাবমিট করে কাজ পায় মেসার্স রুবিনা কনস্ট্রাকশন, মেসার্স আব্দুল্লাহ জুনায়েদ ট্রেডার্স ও তুলসীগঙ্গা ট্রেডার্স নামে তিন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। কাজের কার্যাদেশ পেতে টেন্ডার সিকিউরিটি ও পারফরমেন্স সিকিউরিটি বাবদ অর্থ জমা দিতে হবে ওই তিন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে। অর্থ সংকটে তারা ঋণ নিতে যোগাযোগ করেন এনআরবিসি ব্যাংক ক্ষেতলাল শাখাতে। তৎকালিন ব্যাংকের ব্যবস্থাপক মো. আহসান হাবীবের সাথে কথা হয় ওই তিন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের। তাদের নিজ একাউন্টে ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা জমা রয়েছে। পাঁচটি টেন্ডার আইডির বিপরীতে টেন্ডার সিকিউরিটি ও পারফরমেন্স সিকিউরিটি বাবদ পেঅর্ডার জমা দিতে হবে ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩১০ টাকার। একাউন্টে থাকা টাকার সাথে সমন্বয় করে ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩১০ টাকার পেঅর্ডার ব্যাংক থেকে দেওয়া হলেও সেগুলো ছিল নকল। এসবের কারনে তাদের নামে ঋণ দেওয়ার কথা থাকলেও তা করা হয়নি।
অনলাইনে টেন্ডার আহবান করার নিয়ম অনুযায়ী টেন্ডার সিকিউরিটি ও পারফরমেন্স সিকিউরিটি বাবদ যে ব্যাংক থেকে পেঅর্ডার করা হবে, মুলত সেই ব্যাংকের লকারেই পেঅর্ডারগুলো জমা থাকবে। এক্ষেত্রে টেন্ডার আহবান করা প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র পেঅর্ডার হয়েছে মর্মে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ অনলাইনে ওই দপ্তরকে কনফার্ম ম্যাসেজ পাঠাবে।
ব্যাংকগুলো পেঅর্ডার করার পর ম্যাসেজ পাঠালে তা সঠিক না নকল জানারও কোনো সুযোগ নেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর। কেবলমাত্র কাজের মেয়াদ শেষে পেঅর্ডারগুলো অবমুক্তির পর নিজ একাউন্টে জমা হলেই তা নিশ্চিত হওয়া যায়। কালাই পৌর কর্তৃপক্ষ ওই তিনটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানকে কাজের মেয়াদ শেষে ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩১০ টাকার পেঅর্ডার চলতি বছরের জুলাই মাসে অবমুক্তি করে ব্যাংকে চিঠি দেয়। এরপরেই ঠিকাদাররা ওই পেঅর্ডারগুলো নকল বলে জানতে পারেন।
টেন্ডার সূত্রে জানা গেছে, টেন্ডার সিকিউরিটি ও পারফরমেন্স সিকিউরিটি বাবদ মের্সাস রুবিনা কনস্ট্রাকশনের দুটি আইডিতে জমা দিতে হবে ১৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ; বিপরীতে নিজ একাউন্টে জমা ছিল ৮ লাখ ২০ হাজার টাকা। আব্দুল্লাহ জুনায়েদ ট্রেডার্সের আইডিতে ৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ; জমা ছিল ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং তুলসীগঙ্গা ট্রেডার্সের দুটি আইডিতে ১৩ লাখ ৬১ হাজার ৩১০ টাকা ; জমা ছিল ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ৭মে কালাই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলীর নামে পাঁচটি পেঅর্ডার ইস্যু করেন এনআরবিসি ব্যাংক ক্ষেতলাল শাখা। পাঁচটি পেঅর্ডারে মোট পরিমান ছিল ৪৩ লাখ ৩৬ হাজার ৩১০ টাকা। ঠিকাদারদের দাবি, পৌরসভা পেঅর্ডারগুলোর ম্যাসেজ গ্রহণের পর কাজের অনুমতি দেন এবং কাজ শেষে অবমুক্তির ছাড়পত্রও দেন। ছাড়পত্রের চিঠি নিয়ে ব্যাংকে গেলে পেঅর্ডারগুলো নকল বলে জানা যায়। এ সংক্রান্ত কোনো ডকুমেন্ট ব্যাংকে নেই বলে জানান ব্যবস্থাপক। একই সাথে নিজ একাউন্টের টাকাও ব্যবস্থাপক তার প্রতিষ্ঠানের নামে একাউন্টে পার করেছেন।
লেনদেনের সীট অনুযায়ী, পেঅর্ডার ইস্যুর পাঁচ দিন পর ১২ মে তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক আহসান হাবিব তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নামীয় দুটি চেক দিয়ে ঠিকাদারদের একাউন্ট থেকে ১৫ লাখ ৮১ হাজার ৫০০ টাকা তার নিজস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান মেসার্স ফকির কর্পোরেশনের ৩৩৩০০০০৪৭৪৭ হিসাবে নম্বর স্থানান্তর করেছেন। চেক দুটিতে ‘ঝবষভ’ লেখা, ব্যবস্থাপকের স্বাক্ষর ও তার প্রতিষ্ঠানের সিল রয়েছে। একাউন্টে থাকা বাকি টাকারও কোনো হদিস নেই। বর্তমানে একাউন্টগুলো লক করে রাখা হয়েছে। ফলে লেনদেন বন্ধ রয়েছে।
রুবিনা কনস্ট্রাকশনের স্বত্তধীকার রেজাউল ইসলাম বলেন, পেঅর্ডার অবমুক্তির ছাড়পত্র নিয়ে ব্যাংকে গেলে বর্তমান ব্যবস্থাপক পূর্বের ব্যবস্থাপকের অজুহাত দেখিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে। ব্যাংকে কয়েকবার যাওয়ার পর পেঅর্ডারগুলো নকল বলে জানানো হয়। ব্যাংকের এমডিকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে কিন্তু কোনো সমাধান পাইনি। তিনি আরও বলেন, একাউন্টে থাকা টাকাও নেই। ব্যাংকের ব্যবস্থাপক যদি গ্রাহকের টাকা নিজের একাউন্টে পার করে নেন, তাহলে এর দায় অবশ্যই ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে।
মেসার্স আব্দুল্লাহ জুনায়েদ ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী তোহিদুল বারী শেখ বলেন, গত বছর ১৩ নভেম্বর এনআরবিসি ব্যাংকে ৮ লাখ ১০ হাজার টাকার পেঅর্ডার করেছি। ব্যাংক পেঅর্ডারটি আপলোড করেছে। চূড়ান্ত বিল পাওয়ার পর পৌরসভা আবার ইজিপি সিস্টেমেই পেঅর্ডারটি রিলিজ করেছে। এখন টাকা চাইলেই ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলে পেঅর্ডারে সমস্যা আছে। আজও টাকা পাইনি। এই যদি ব্যাংকের অবস্থা হয়, তাহলে যাবো কোথায়।
সাবেক ব্যবস্থাপক আহসান হাবিব বলেন, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লেনদেনে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া অনুসরণে ভুল হয়েছিল। সেই ভুল সংশোধনের আগেই আমাকে ওএসডি করে হেড অফিসে সংযুক্ত করেছে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পেঅর্ডারের ১৮ লাখ ৪০ হাজার টাকা ফেরতের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারেননি।
নকল পেঅর্ডারগুলো বিষয় নিশ্চিত করে বর্তমান ব্যবস্থাপক আব্দুল কাইয়ুম বলেন, ভূক্তভোগী ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পেঅর্ডারের বিষয় আমার জানা। তবে আপনারা ব্যাংকের গ্রাহক কিংবা বাংলাদেশ ব্যাংক, বিএফআইইউ বা দুদকের কেউ না, আমি এসব তথ্য দিতে বাধ্য নই। তবে এ বিষয়ে ব্যাংকের অভ্যন্তরে অর্ডিট চলমান রয়েছে।
কালাই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন,
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পেঅর্ডার করলে তা নিদিষ্ট সার্ভারে আপলোড করবেন এবং আপলোড ফাইল কর্তৃপক্ষকে অনলাইনেই পাঠাবেন।
এক্ষেত্রে তথ্য দেখা ছাড়া যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। পেঅর্ডারের মুলকপি ব্যাংক লকারে সংরক্ষিত থাকে। জামানতের মেয়াদ শেষ হলে কর্তৃপক্ষ পেঅর্ডার অবমুক্তির ছাড়পত্র দেয়। তখন প্রতিষ্ঠানগুলো জামানতের টাকা ফেরত পায়।
এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে নকল পেঅর্ডার দিয়ে অন্যর একাউন্ট থেকে অর্থ আত্মসাৎ করা বড় অপরাধ।




