নারীরা কি গাড়ি চালাতে পারবেন, ইসলাম কী বলে?

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা, যা মানুষের প্রয়োজন ও মানবিক মর্যাদাকে সবসময় অগ্রাধিকার দেয়। আধুনিক যুগে প্রাত্যহিক জীবনের অন্যতম অপরিহার্য উপাদান হলো যানবাহন। পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও পারিবারিক, সামাজিক ও জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হতে হয়। তবে নারীরা গাড়ি চালাতে পারবেন কি না—এ বিষয়ে ইসলামি শরিয়তের স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ইসলাম নারীর স্বাধীনতা ও প্রয়োজনীয়তাকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি তার আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা ও শালীনতার সুরক্ষায় কিছু জরুরি মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে।

গাড়ি চালানো মূলত বৈধ: শরিয়তের মূলনীতি

ইসলামের বিধান অনুযায়ী, নারী কোনো যানবাহনে আরোহণ করা যেমন বৈধ, একইভাবে কোনো বাহন নিজে চালানোও মূলত বৈধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবিদের যুগে নারীরা তৎকালীন বাহন (যেমন উট ও ঘোড়া) হাঁকিয়ে যাতায়াত করতেন। এ প্রসঙ্গে প্রিয় নবী (সা.) উষ্ট্রারোহী নারীদের প্রশংসাও করেছেন—

خَيْرُ نِسَاءٍ رَكِبْنَ الإِبِلَ صَالِحُ نِسَاءِ قُرَيْشٍ أَحْنَاهُ عَلَى وَلَدٍ فِي صِغَرِهِ وَأَرْعَاهُ عَلَى زَوْجٍ فِي ذَاتِ يَدِهِ

‘উট চালনাকারী নারীদের মধ্যে কুরাইশের নেককার নারীগণই সর্বোত্তম। তারা সন্তানের প্রতি শৈশবে সর্বাধিক স্নেহশীল এবং স্বামীর সম্পদের সর্বোত্তম হেফাজতকারী।’ (বুখারি ৫০৮২, মুসলিম ২৫২৭)

কাতারের আওকাফ ও ইসলাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ‘ইসলামওয়েব’-এর ফতোয়াতেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো নিষিদ্ধ পর্যায়— যেমন অননুমোদিত দীর্ঘ সফর বা পরপুরুষের সাথে নির্জনতা তৈরি না হলে নারীর গাড়ি চালানো সম্পূর্ণ জায়েজ।

জরুরি পরিস্থিতি ও নিরাপত্তার অগ্রাধিকার

বাস্তব জীবনের নানা প্রয়োজনে একজন নারীর গাড়ি চালানো কেবল বৈধই নয়, ক্ষেত্রবিশেষে অধিক নিরাপদও হতে পারে—

  • পরিবারের সংকটময় মুহূর্ত: স্বামী অসুস্থ বা অক্ষম হলে এবং পরিবারের কোনো মাহরাম পুরুষ না থাকলে জরুরি প্রয়োজনে নারী নিজেই গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে বা গন্তব্যে যেতে পারেন।
  • নিরাপত্তার ঝুঁকি: পায়ে হেঁটে বা অনিরাপদ গণপরিবহনে চলাচল করলে যদি নারীর ক্ষতি বা হেনস্তার আশঙ্কা থাকে, তবে ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে যাতায়াত করা তার সম্মানের জন্য অনেক বেশি সুরক্ষিত।

নারীর গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে শরিয়তের আবশ্যক শর্ত

১. শালীনতা ও পর্দার বিধান বজায় রাখা

গাড়ি চালানোর সময় পোশাক-পরিচ্ছদ ও আচরণে পূর্ণ শালীনতা বজায় রাখা ফরজ। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ۚ ذَٰلِكَ أَدْنَىٰ أَن يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ

‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের, কন্যাদের এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না।’ (সুরা আল-আহজাব: আয়াত ৫৯)

অসুস্থতা বা অপারগতায় কি নামাজ ছাড়া যাবে?

২. দূরপাল্লার সফরে মাহরাম পুরুষ সঙ্গে থাকা

শহরের ভেতর বা স্বাভাবিক দূরত্বে চলাচলে মাহরাম আবশ্যক না হলেও দূরপাল্লার দীর্ঘ সফরে মাহরামের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—

لاَ يَحِلُّ لاِمْرَأَةٍ تُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ تُسَافِرُ مَسِيرَةَ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ إِلاَّ مَعَ ذِي مَحْرَمٍ عَلَيْهَا

‘আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাসী কোনো নারীর জন্য সঙ্গে মাহরাম পুরুষ ছাড়া এক দিন ও এক রাতের পথ সফর করা বৈধ নয়।’ (মুসলিম ১৩৩৯)

৩. গায়রে মাহরামের সাথে নির্জনতা (খালওয়াত) পরিহার করা

গাড়ির মতো আবদ্ধ স্থানে কোনো পরপুরুষের সাথে নির্জনে একা বসা বা যাতায়াত করা হারাম। নবীজি (সা.) সতর্ক করে বলেছেন—

لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلاَّ كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ

‘কোনো পুরুষ যখনই কোনো (গায়রে মাহরাম) নারীর সঙ্গে নির্জনে একাকী মিলিত হয়, তখন শয়তান তাদের তৃতীয় সঙ্গী হয়।’ (তিরমিজি ১১৭১)

ইসলাম নারীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখার পক্ষে নয়, বরং তার ইজ্জত-আব্রু ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদনের পূর্ণ অধিকার দেয়। তাই কোনো নারী যদি পর্দার বিধান অক্ষুণ্ন রেখে, পরপুরুষের সাথে নির্জনতা এড়িয়ে এবং দূরপাল্লার ক্ষেত্রে মাহরাম সঙ্গে রেখে গাড়ি চালান, তবে তা শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ প্রশংসনীয় ও বৈধ। এতে তার স্বাবলম্বিতা প্রকাশ পায় এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ থেকেও নিজেকে নিরাপদে রাখা সম্ভব হয়।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

স্কুলের পুকুর লিজ নিয়ে বিরোধ: কালীগঞ্জে শিক্ষককে মারধর ও যৌন নিপীড়নের অভিযোগে ফাঁসানোর নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ তুলে এক সহকারী শিক্ষককে স্কুলের