প্রায় ১৮ মাস দায়িত্ব পালনের পর পদত্যাগ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসচিব ড্যান ড্রিসকল। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে চলা টানাপোড়েনের মধ্যেই তার এই বিদায়।
হোয়াইট হাউস সোমবার ড্রিসকলের পদত্যাগের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিবিসির মার্কিন অংশীদার সিবিএস জানিয়েছে, ড্রিসকল ও হেগসেথের মধ্যে কয়েক মাস ধরে মতবিরোধ চলছিল। তবে তাদের দ্বন্দ্বের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো পুরোপুরি প্রকাশ্যে আসেনি।
রয়টার্সও জানিয়েছে, হেগসেথের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যেই ড্রিসকল পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
৪১ বছর বয়সি ড্রিসকল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সি সেনাসচিব হিসেবে পরিচিত। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনে তাকে প্রায়ই ‘ট্রাম্পের ড্রোন-ম্যান’ বলা হতো।
ড্রিসকলের পদত্যাগের বিষয়ে সিবিএসকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস তার প্রশংসা করেছে। এতে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা স্ট্রং অ্যাগেইন’ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে ড্রিসকল ‘অত্যন্ত কার্যকর’ ভূমিকা রেখেছেন। সামরিক অভিযানেও তিনি ‘অসাধারণ নেতৃত্ব’ দিয়েছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে আলোচনায় তার ভূমিকার কথাও উল্লেখ করেছে হোয়াইট হাউস।
ড্রিসকলের পদত্যাগ নিয়ে হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন ও মার্কিন সেনাবাহিনীর কাছে মন্তব্য চেয়েছে বিবিসি।
পেন্টাগনে একের পর এক পরিবর্তন
ড্রিসকলের পদত্যাগ এমন এক সময়ে হলো, যখন মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিক পরিবর্তন চলছে।
এর আগে এপ্রিলে নৌবাহিনীর সচিব জন ফেলান দায়িত্ব ছাড়েন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেগসেথের চাপের মুখে তাকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পরে বলেছিলেন, ফেলানের অন্যদের সঙ্গে কিছু ‘দ্বন্দ্ব’ ছিল।
এ ছাড়া সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ জেনারেল র্যান্ডি জর্জ এবং জেনারেল ক্রিস্টোফার ডোনাহুসহ আরো কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা সম্প্রতি দায়িত্ব ছেড়েছেন।
পেন্টাগনে দায়িত্ব নেওয়ার পর হেগসেথ এক ডজনের বেশি জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে নৌবাহিনীর প্রধানও রয়েছেন।
হেগসেথের সঙ্গে বিরোধের নেপথ্যে কী
ড্রিসকল ও হেগসেথের মধ্যকার বিরোধের বিস্তারিত এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ড্রিসকলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন জেনারেল র্যান্ডি জর্জ। এপ্রিলে হেগসেথ জর্জকে সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফের পদ ছাড়তে বলেন। পরে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যান। এ ঘটনায় ড্রিসকলের সঙ্গে হেগসেথের টানাপোড়েন আরো বাড়ে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ড্রিসকল ও জর্জ এর আগে সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন এবং ড্রোনসহ চালকবিহীন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরে সেই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কমিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেয় সেনাবাহিনী। এ নিয়েও ড্রিসকল ও পেন্টাগনের নেতৃত্বের মধ্যে মতবিরোধ ছিল বলে সিবিএস জানিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেনাসচিব দেশটির সেনাবাহিনীর শীর্ষ বেসামরিক নেতা। সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সেনাদের পাশাপাশি ন্যাশনাল গার্ড ও রিজার্ভ সেনাদের পরিচালনার ক্ষেত্রেও তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে।
সেনাবাহিনী থেকে ইউক্রেন যুদ্ধের আলোচনায়
ড্রিসকল নিজেও আগে মার্কিন সেনাবাহিনীতে কাজ করেছেন। ২০০৭ সালে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেওয়ার পর তিনি একটি অশ্বারোহী প্লাটুনের নেতৃত্ব দেন। ২০০৯ সালে ইরাকে মোতায়েন ছিলেন। পরে সেনাবাহিনী ছেড়ে আইন ও বিনিয়োগ খাতে কাজ করেন।
সেনাসচিব হওয়ার পর যুদ্ধক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতি তার আগ্রহের কারণে ড্রিসকল ‘ট্রাম্পের ড্রোন-ম্যান’ হিসেবে পরিচিতি পান। ড্রোন ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির আধুনিকায়নে তিনি জোর দেন।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে ট্রাম্পের উদ্যোগেও ড্রিসকল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তিনি ইউক্রেন ও রাশিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক এবং এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশ সফর করেন।
ড্রিসকল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাবেক উপদেষ্টা। ইয়েল ল স্কুলে পড়ার সময় তাদের পরিচয় হয়।
ট্রাম্প প্রশাসনে ড্রিসকলের দায়িত্বের পরিধি আরো বিস্তৃত ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
এ ছাড়া তিনি ব্যুরো অব অ্যালকোহল, টোব্যাকো, ফায়ারআর্মস অ্যান্ড এক্সপ্লোসিভসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সূত্র: বিবিসি



