তিনতলা এক ভবনেই দুই মাদ্রাসা। রাজধানীর প্রধান সড়ক থেকে অলিগলি, সবখানেই রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠান। মোহাম্মদপুরের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড ঘুরে মিলেছে অন্তত ৭৯টি মাদ্রাসার খোঁজ। সেই তুলনায় এই ওয়ার্ডে স্কুল অর্ধেক, ৪০টির মতো।
কারা গড়ছেন এমন প্রতিষ্ঠান? কতটুকুইবা নিশ্চিত করা যাচ্ছে শিক্ষার মান আর পরিবেশ?
স্থানীয়রা জানান, এলাকার প্রায় প্রতিটি গলিতে মাদ্রাসা রয়েছে। এমনকি, একটি কক্ষ পেলেই সেখানে মাদ্রাসা গড়ে তোলা হয়। ফলে পাঁচ মিনিট হাঁটলেও একটি মাদ্রাসা থেকে আরেকটি মাদ্রাসায় পৌঁছে যাওয়া যায়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, পড়াশোনার জন্য এত বেশি মাদ্রাসা থাকলে সেখানে কীভাবে পড়াশোনা পরিচালিত হয়?
আল বিরুনী মাদরাসা এন্ড ইসলামিক স্কুল। সরু সিঁড়ি বেয়ে যেতে হবে তিনতলায়। যেখানে সিঁড়ির কোনো রেলিংও নেই। দোতলাতেও আরেকটি মাদরাসা রয়েছে মারকাযুল কুরআন ক্যাডেট মাদরাসা। কিন্তু বারবার দরজায় কড়া নাড়ার পরও সাড়া মেলেনি। তিনতলার আল-বেরুনীতে দুটি রুমে চলছে পাঠদান। নেই কোনো অফিসকক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ জানান, অনুমোদন নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তবে এখনও অনুমোদনের বিষয়টি নিশ্চিত হয়নি।
পাশের গলিতেই পুরো ৫ তলা ভবনজুড়ে রয়েছে মাদরাসাতুল ইসলাহ নামে আবাসিক-অনাবাসিক কওমি মাদরাসা। যেখানে হিফজ-নাজেরাসহ ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করানো হয়। চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় মেয়ে শিশুদের আলাদা শ্রেণিকক্ষ ও থাকার জায়গা। ছেলে শিশুদের দায়িত্বে থাকা শিক্ষক জানান, ছেলেদের শ্রেণিকক্ষে সিসি ক্যামেরা থাকলেও মেয়েদের রুমগুলোতে তা নেই। চতুর্থ ও পঞ্চম তলার পুরো ব্যবস্থাপনায় রয়েছেন নারী শিক্ষক।
এই প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃপক্ষ বলেন, ‘মেয়ে শাখায় শুধু সিঁড়িতে ক্যামেরা রয়েছে। কক্ষের ভেতরে কোনো ক্যামেরা নেই। ১০ থেকে ১২ বছর বয়সী বাচ্চারা তো সবকিছু দেখতে পারবে না।’
এদিকে, মাদরাসাতুল ইসলাহ ঢাকার সহসভাপতি এম এ মান্নান মনির বলেন, ‘আমাদের ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে প্রায় ৭৯টি মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে এমন কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও আছে, যেখানে প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার কোনো পরিবেশ নেই। এসব প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনা উচিত, সেগুলো কওমি মাদ্রাসা হোক কিংবা আলিয়া মাদ্রাসা।’
মাদরাসুল ইসলাহের পাশের শেরেবাংলা সড়ক ধরে ৫০০ মিটারের মধ্যে রয়েছে আরও ৬টি মাদ্রাসা। যেখানে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেই নেই পাঠদানের পরিবেশ। নোংরা স্যাঁতসেঁতে বাড়ি-ভবনে চলছে কার্যক্রম।
তবে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডেই মানসম্মত পরিবেশেও চলছে কিছু মাদ্রাসা।
এদেরই একটি উম্মুল কুরা ইনস্টিটিউট। এর প্রতিষ্ঠাতা মুফতি ইয়াসিন কাসেমী জানালেন, কওমি কারিকুলামে শিক্ষিতদের কর্মসংস্থানের অভাব রয়েছে। তাই অনেকে মানের দিকে অতটা নজর না দিয়ে কোনো রকমে গড়ে তুলছেন মাদ্রাসা।
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারেরও আমাদের প্রতি কিছুটা দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে যেসব শিক্ষার্থী গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করছে, তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, সমাজের বিভিন্ন খাতে কাজে লাগানো এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সব ক্ষেত্রে সুযোগ করে দেওয়ার বিষয়েও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এসব সুযোগ তৈরি করা হলে তারা সরকারি পর্যায়েও বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে পারবে।’
দেশের সবচেয়ে বড় কওমি মাদ্রাসা বোর্ড, বেফাকের মহাসচিব জানান, সরকারি বরাদ্দ ও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা না থাকায় তাদের নজরদারি ও তদারকি সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
তবে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে যে বাস্তবতা রয়েছে, কওমি মাদ্রাসার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা বিদ্যমান। তবে যেখানেই মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, সেগুলোকে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। এ জন্য আমাদের পরিদর্শক ও দায়িরা রয়েছেন, যাঁরা খুঁজে খুঁজে মাদ্রাসাগুলো চিহ্নিত করেন। এসব মাদ্রাসাকে মনিটরিং ও তত্ত্বাবধানের আওতায় আনার জন্য আমরা সচেষ্ট রয়েছি।’
বেফাকের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, দেশে ৩৫ হাজারের বেশি কওমি মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে নিবন্ধিত ১৯ হাজার ৩১০টি। তবে হু হু করে বাড়তে থাকা এসব মাদ্রাসার প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।



