হত্যা মামলার আসামি আ.লীগ নেতা মিছিলে, মিষ্টি খাওয়ালেন বিএনপির দুই নেতা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় ঠাকুরগাঁওয়ের ভূল্লী উপজেলায় আনন্দ মিছিল ও মিষ্টি বিতরণ করেছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে ভূল্লী ডিগ্রি কলেজ মাঠ থেকে আনন্দ মিছিলটি বের করা হয়। এতে ভূল্লী ডিগ্রি কলেজ ও কুমারপুর উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। মিছিলটি বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে কলেজ মাঠে ফিরে আসে। পরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা পরস্পরের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেন।

ওই মিছিলে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ও ভূল্লী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ জুলফিকার আলীকে অংশ নিতে দেখা গেছে। পরে তাকে মিষ্টি খাওয়াতে দেখা যায় বিএনপির স্থানীয় দুই নেতাকে।

আনন্দ মিছিলের ওই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ঠাকুরগাঁওজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের হওয়া হত্যা মামলায় নাম থাকা একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রকাশ্য কর্মসূচিতে দেখা যাওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীসহ স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীদের অনেকে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আনন্দ মিছিলের একপর্যায়ে অধ্যক্ষ জুলফিকার আলীও মিছিলে অংশ নেন। পরে ভূল্লী ডিগ্রি কলেজের শিক্ষক ও সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি নাজমুল ইসলাম লাল এবং ভূল্লী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক ও জেলা বিএনপির মৎস্যবিষয়ক সম্পাদক মিজানুর রহমান তাকে মিষ্টি খাওয়ান।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঠাকুরগাঁওয়ে চার তরুণকে হুমকি ও হত্যার অভিযোগে জুলফিকার আলীর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। নিহত শিক্ষার্থী আবু রায়হানের বাবা ফজলে আলম বাদী হয়ে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁওয়ের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে মামলাটি করেন। ওই মামলায় জুলফিকার আলীকে নামীয় আসামি করা হয়। মামলার পর দীর্ঘ সময় তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি বলে স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী ও বাসিন্দারা জানান।

জুলাইযোদ্ধা আবু বক্কর বলেন, জুলাই আন্দোলনে আমরা অন্যায়, নির্যাতন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছিলাম। সেই আন্দোলনে আমাদের অনেক সহযোদ্ধা আহত হয়েছেন, অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন। অথচ সেই আন্দোলনের ঘটনায় হত্যা মামলায় নাম থাকা একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রকাশ্য আনন্দ মিছিলে দেখা যাচ্ছে। বিএনপির কয়েকজন নেতাকে তাকে মিষ্টি খাওয়াতেও দেখা গেছে। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের ও হতাশার।

তিনি আরও বলেন, কেউ আইনগতভাবে জামিনে থাকলে আদালতের আদেশের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু একজন মামলার আসামিকে প্রকাশ্য কর্মসূচিতে নিয়ে এসে মিষ্টি খাওয়ানোর দৃশ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্ন বার্তা দেয়। এতে জুলাইযোদ্ধাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।

জুলাই আন্দোলনের সমন্বয়ক রায়হান অপু বলেন, যে আন্দোলনে মানুষ জীবন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, সেই আন্দোলনের ঘটনায় হত্যা মামলায় নাম থাকা একজন আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রকাশ্য মিছিলে নিয়ে এসে মিষ্টি খাওয়ানোর দৃশ্য অত্যন্ত দুঃখজনক ও নিন্দনীয়। জুলাইয়ের রক্তের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক আপস আমরা মেনে নেব না।

তিনি আরও বলেন, কী কারণে একজন হত্যা মামলায় নাম থাকা ব্যক্তিকে প্রকাশ্য কর্মসূচিতে নিয়ে এসে মিষ্টি খাওয়ানো হলো, সংশ্লিষ্টদের তা পরিষ্কার করা উচিত। জুলাইযোদ্ধারা রাজপথে রক্ত দিয়েছে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য নয়।

স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জুলফিকার আলী একা এতটা সাহস করে প্রকাশ্যে আনন্দ মিছিলে আসার সুযোগ পেতেন না। বিএনপি নেতা নাজমুল ইসলাম লাল ও মিজানুর রহমান তাকে সাহস জুগিয়েছে বলে আমরা মনে করি। তাদের সহযোগিতা না থাকলে হত্যা মামলায় নাম থাকা আওয়ামী লীগের ওই নেতা এভাবে প্রকাশ্যে মিছিলে অংশ নেওয়ার সাহস করতেন না।

তারা আরও বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় জুলফিকার আলীর বিরুদ্ধে আমাদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও মামলা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেককে বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়নি, মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা হয়েছে, এমনকি জেলও খাটতে হয়েছে। সেই সময় আমরা রাজপথে থেকে এসব পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। আজ যদি কেউ সেই অতীত ভুলে গিয়ে তার সঙ্গে প্রকাশ্যে সখ্য গড়ে তোলেন, তাহলে সেটি আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টের ও অপমানজনক। নাজমুল ইসলাম লাল ও মিজানুর রহমানের ভূমিকা দলীয়ভাবে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তা না হলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা আরও বাড়বে।

মিছিলে অংশ নেওয়া ও জুলফিকার আলীকে মিষ্টি খাওয়ানোর বিষয়ে নাজমুল ইসলাম লাল ও মিজানুর রহমানের বক্তব্য জানতে তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলেও তারা কল রিসিভ করেননি।

জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. পয়গাম আলী বলেন, বিষয়টি আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। জুলফিকার আলী যদি মামলার আসামি হয়ে থাকেন, তাহলে তার মিছিলে অংশ নেওয়ার বিষয়টি ব্যক্তিগত। এ ঘটনায় বিএনপির কোনো সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত বা সম্পৃক্ততা নেই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন