দুই বছর পেরিয়ে গেছে। ক্যালেন্ডারের পাতা বদলেছে, ঋতু পাল্টেছে। কিন্তু সাভারের ব্যাংকটাউনের একটি কবরের সামনে দাঁড়ালে মনে হয়, সময় যেন থমকে আছে সেই রক্তাক্ত ১৮ জুলাইয়েই। প্রতি বছর দিনটি ফিরে এলে পরিবারের কাছে ফিরে আসে সেই বিকেলের স্মৃতি—যেদিন আন্দোলনে গিয়ে আর জীবিত ফেরেননি মেধাবী শিক্ষার্থী শাইখ আসহাবুল ইয়ামিন।
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সাভারের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হন রাজধানীর মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)’র কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়ামিন। পরে তাকে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ ছিল, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও ইয়ামিন যথাযথ মানবিক সহায়তা পাননি। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করে।
দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকীতে ছেলের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাবা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমার এক ছেলে, এক মেয়ে। ইয়ামিন ছিল আমাদের বুকের ধন। সেদিন জোহরের নামাজ পড়ে আন্দোলনে গিয়েছিল। বিকেলে ফিরল, তবে নিথর হয়ে। এমন শোক যেন আর কোনো বাবা-মাকে বয়ে বেড়াতে না হয়।’
পরিবারের দাবি, মৃত্যুর পর ইয়ামিনের মরদেহ দাফন করতেও নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছিল। পরে সাভারের ব্যাংকটাউন এলাকায় এক বন্ধুর সহায়তায় তাকে দাফন করা হয়।
মাত্র ২৩ বছর বয়সেই থেমে যায় সম্ভাবনাময় এক জীবনের পথচলা। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করার পর তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত এমআইএসটির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে ভর্তি হন।
ইয়ামিন হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন। আদালত মামলার তদন্তের স্বার্থে কয়েকজনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। সম্প্রতি এক পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আগামী ১২ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার সকালে সাভারের ব্যাংকটাউনে ইয়ামিনের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, কোরআনখানি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে শহীদ ইয়ামিন ফাউন্ডেশন। একই দিনে এমআইএসটিতেও আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সহপাঠী ও স্বজনেরা ইয়ামিনের স্মৃতিচারণ করেন এবং তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।












