আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের দুনিয়ায় কিছু কিছু খবর আসে মৃদু হাওয়ার মতো, আর কিছু খবর আসে দশ মাত্রার প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের মতো।
লন্ডন রয়টার্সের হেডকোয়ার্টারে যখন রাতের শিফটের সাংবাদিকরা কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ করেই তাদের ডেস্কে এসে পৌঁছাল এক ‘মেগা এক্সক্লুসিভ’ সাক্ষাৎকার।
সাক্ষাৎকারটি দিয়েছেন এমন একজন নারী, যিনি একসময় একটি আস্ত দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্ত্রী ছিলেন, কিন্তু আজ তিনি এক পলাতক, দেশছাড়া এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডের সাজার মুখে থাকা দাগি আসামি। তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
খবরটি কী?
শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের দিকে তিনি এবং তার দলের শীর্ষ নেতারা ভারত থেকে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করার পরিকল্পনা করছেন!
একটি স্বাধীন দেশে যখন তার রাজনৈতিক দল সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ, যখন দেশের প্রতিটি ধূলিকণা তার বিচার চাইছে, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার জন্য ফাঁসির দড়ি বা মৃত্যুদণ্ডের সাজা অপেক্ষা করছে…ঠিক তখন তিনি বলছেন তিনি দেশে ফিরে আসবেন! এবং এসে আত্মসমর্পণ করবেন!
রাজনীতির সাধারণ ব্যাকরণ বলে, কোনো স্বৈরাচারী শাসক নিজের ইচ্ছায় কখনো ফাঁসির মঞ্চে ফিরে আসে না। মুসোলিনি থেকে শুরু করে রাজা পাকশে…ইতিহাস সাক্ষী, স্বৈরাচারীরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত পালাতে চায়, বাঁচতে চায়।
তাহলে শেখ হাসিনা কেন বলছেন তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন?
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলের মতে, এটি মোটেও কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। এটি হলো সাউথ ব্লকের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে লেখা একটি নিখুঁত, সুপরিকল্পিত এবং মাস্টারমাইন্ড ‘স্ক্রিপ্ট’ বা চিত্রনাট্য!
দিল্লি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে তাদের আধিপত্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ভারতের কোনো চোখরাঙানিকে পাত্তাই দিচ্ছে না। ভারত চেষ্টা করেছে বর্ডারে পুশ-ইন করে, পানি আটকে, মিডিয়াতে প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে ঢাকাকে চাপে ফেলতে। কিন্তু ঢাকা প্রতিটি চালেই ভারতকে উল্টো চেকমেট করে দিয়েছে।
দিল্লির এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। তারা বুঝতে পারছে, তাদের সেই পুরোনো ‘সেবাদাসী’ বা আজ্ঞাবহ পুতুলকে যদি কোনোভাবে আবার বাংলাদেশের সিস্টেমের ভেতরে ঢোকানো না যায়, তবে এই অঞ্চলে ভারতের দাদাগিরি চিরতরে খতম হয়ে যাবে।
আর এই সেবাদাসীকে পুনরায় ‘রিস্টোর’ বা পুনর্বহাল করার জন্যই তৈরি হয়েছে এই ডিসেম্বরের আত্মসমর্পণের স্ক্রিপ্ট!
তাদের পরিকল্পনা হলো…একটি ‘ট্রোজান হর্স’ বা কাঠের ঘোড়ার মতো শেখ হাসিনাকে দেশে পাঠানো। ভারত জানে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে সাথে সাথে গ্রেপ্তার করা হবে এবং ট্রাইব্যুনালে তোলা হবে। আর ঠিক এটাই ভারতের আসল উদ্দেশ্য!
ভারত চায়, শেখ হাসিনা দেশে গিয়ে গ্রেপ্তার হোন। এর ফলে আন্তর্জাতিক মিডিয়া, মানবাধিকার সংস্থা এবং পশ্চিমা বিশ্বের কিছু ভারতপন্থী লবিস্টকে কাজে লাগিয়ে তারা একটি নতুন প্রোপাগান্ডা শুরু করবে। তারা বলবে…”দেখুন, বাংলাদেশে কোনো আইনের শাসন নেই, একজন বয়স্ক সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার বানানো হচ্ছে!”
তারা একটি আইনি সার্কাস বা গোলকধাঁধা তৈরি করতে চায়। তারা চায় দেশের ভেতরে থাকা তাদের স্লিপার সেল, বাতিল হওয়া আমলা এবং বিচারব্যবস্থার ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু দালালকে দিয়ে একটি কৃত্রিম অস্থিতিশীলতা বা ক্যাওস তৈরি করতে। ভারত ভাবে, শেখ হাসিনা যদি দেশের ভেতরে থাকেন (তা সে কারাগারেই হোক), তবে তার অনুসারীরা অন্তত একটি কেন্দ্রবিন্দু পাবে এবং দেশের ভেতরে লাগাতার দাঙ্গা বা নাশকতা সৃষ্টির একটি কারণ খুঁজে পাবে।
এটি হলো একটি দেশকে ভেতর থেকে জ্বালিয়ে দেওয়ার এক পৈশাচিক ভূ-রাজনৈতিক ছক।
তবে এই থ্রিলারের মুদ্রার আরেকটি পিঠও আছে। অনেকেই মনে করছেন, এই রয়টার্সের সাক্ষাৎকারটি হয়তো কোনো মাস্টারপ্ল্যান নয়, এটি স্রেফ একটি চরম মাত্রার ‘চাপাবাজি’ বা রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি!
কেন এই চাপাবাজি?
শেখ হাসিনা এবং তার দলের শীর্ষ নেতারা ভারতে বসে খুব ভালো করেই বুঝতে পারছেন যে, দেশের ভেতরে থাকা তাদের দলের অবশিষ্ট কর্মী এবং সুবিধাভোগীরা চরম হতাশায় ভুগছে। তারা দলত্যাগ করছে, লুকিয়ে বেড়াচ্ছে এবং অনেকেই ভাবছে…”নেত্রী তো পালিয়েছে, আমাদের আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই।”
এই হতাশাগ্রস্ত, মৃতপ্রায় কর্মী বাহিনীকে কিছুটা অক্সিজেন দেওয়ার জন্য, তাদের চাঙ্গা রাখার জন্যই হয়তো এই ‘ডিসেম্বরে আসছি’ মার্কা সস্তা চাপাবাজির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। তারা বোঝাতে চাইছে…”তোমরা হাল ছেড়ো না, আমি ডিসেম্বরেই ফিরে আসছি, সব ঠিক হয়ে যাবে!”
এটি হলো রাজনীতিতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক মরিয়া এবং করুণ চেষ্টা। একটি নিষিদ্ধ দলের নেত্রী, যার পায়ের তলায় এক ইঞ্চিও মাটি নেই, সে বিদেশের মাটিতে বসে খবরের কাগজে সাক্ষাৎকার দিয়ে নিজের রাজনৈতিক ভূতকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
বাংলাদেশের মাটি আজ প্রস্তুত। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রস্তুত। ওই চৌদ্দশো শহীদের মায়েরা প্রস্তুত। যদি শেখ হাসিনা সত্যি সত্যিই ভারতের স্ক্রিপ্ট পড়ে দেশে ফিরে আসার দুঃসাহস দেখান, তবে তিনি কোনো রাজনৈতিক গোলকধাঁধায় পার পাবেন না; তিনি সোজা গিয়ে উঠবেন সেই গিলোটিনের মঞ্চে, যা তার জন্যই তৈরি করা হয়েছে।
শীতের কুয়াশা যখন বাংলার আকাশকে ঢেকে দেবে, তখন কি সত্যি সত্যিই কোনো ভারতীয় বিমানে চেপে এই পলাতক স্বৈরাচারী বাংলার মাটিতে পা রাখবেন?
নাকি ডিসেম্বরের সেই কুয়াশায় মিলিয়ে যাবে তার এই ফাঁকা চাপাবাজি?
সাসপেন্স এখন তুঙ্গে! যদি এটি ভারতের কোনো পরিকল্পিত স্ক্রিপ্ট হয়, তবে ভারত তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুলটি করতে যাচ্ছে। কারণ তারা বুঝতে পারছে না, এই নতুন বাংলাদেশের মগজে আর কোনো দাসত্বের সফটওয়্যার নেই। তারা যদি তাদের সেবাদাসীকে আবার এই দেশে রিস্টোর বা পুনর্বহাল করার দুঃস্বপ্ন দেখে, তবে সেই স্বপ্ন এই দেশের মাটিতেই চিরতরে কবর দেওয়া হবে।











