খালের বুকে দেড়’শ বছরের ঐতিহ্য নৌকার হাট

বর্ষার পানিতে যখন খাল-বিলের চেনা পথগুলো আবার নৌযানের পথ হয়ে ওঠে, তখনই যেন প্রাণ ফিরে পায় পিরোজপুরের নেছারাবাদের আটঘর। আটঘর খালের পানিতে ভেসে থাকে সারি সারি কাঠের ডিঙি। কোনো নৌকায় বসে বিক্রেতা অপেক্ষা করছেন ক্রেতার, কোথাও চলছে দরদাম। পছন্দ হলেই বৈঠা হাতে নৌকা বেয়ে বাড়ির পথে রওনা হচ্ছেন কেউ। আবার কেউ নৌকা তুলে নিচ্ছেন ভ্যান কিংবা পিকআপে।
এভাবেই বর্ষা এলেই জমে ওঠে আটঘরের নৌকার হাট। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো এই হাট এখনো টিকে আছে মানুষের প্রয়োজন, জলপথের বাস্তবতা এবং বংশপরম্পরায় নৌকা বানিয়ে আসা কারিগরদের দক্ষতায়।
হাট বসে সপ্তাহে দুই দিন-
আটঘর-কুড়িয়ানা ইউনিয়নের মানপাশা বাজারসংলগ্ন আটঘর খালে বসে এই নৌকার হাট। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের সোমবার ও শুক্রবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চলে বেচাকেনা।
বর্ষা মৌসুমে হাটে নৌকার সরবরাহ ও ক্রেতা—দুটিই বাড়ে। বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত জলপথে যাতায়াত ও কৃষিপণ্য পরিবহনের প্রয়োজন বাড়ায় নৌকার চাহিদাও থাকে বেশি।
হাটে আসা অধিকাংশ নৌকাই ছোট আকারের কাঠের ডিঙি। কৃষক, জেলে ও জলপথনির্ভর পরিবারের মানুষ এসব নৌকার প্রধান ক্রেতা। পেয়ারা-আমড়া সংগ্রহ, মাছ ধরা, কৃষিকাজ কিংবা বর্ষার দিনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াতে এসব নৌকা ব্যবহার করা হয়।
নৌকা কিনেই বৈঠা হাতে ফেরার দৃশ্য-
আটঘরের হাটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দৃশ্যগুলোর একটি নৌকা বিক্রির পরপরই দেখা যায়। নতুন নৌকা কিনে কেউ সেখানেই বৈঠা তুলে নেন হাতে। এরপর খালের পানিতে নৌকার গতির সঙ্গে মিলিয়ে এগিয়ে চলেন বাড়ির পথে।
আবার দূরের ক্রেতাদের কেউ নৌকা তুলে নেন ভ্যান, পিকআপ বা অন্য যানবাহনে।
নৌকার পাশাপাশি হাটে বিক্রি হয় বৈঠাও। নৌকার দাম নির্ভর করে কাঠের ধরন, আকার ও নির্মাণমানের ওপর। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নৌকার দাম কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে আকার ও মানভেদে ৪০–৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
কারিগরের হাতেই বেঁচে আছে পুরোনো শিল্প-
এই হাটের সঙ্গে শুধু ব্যবসা নয়, জড়িয়ে আছে একটি প্রজন্মের পেশাগত ইতিহাস। আশপাশের কয়েকটি গ্রামের কারিগর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে নৌকা নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত। বাবার কাছ থেকে শেখা কাজ ছেলে শিখছেন, পরের প্রজন্মও যুক্ত হচ্ছে একই পেশায়।
একসময় সুন্দরী কাঠ দিয়ে নৌকা তৈরির প্রচলন ছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সুন্দরী কাঠের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ায় বর্তমানে কড়ই, চম্বল, মেহগনিসহ বিভিন্ন কাঠ ব্যবহার করছেন কারিগরেরা।
কাঠ মাপা, কাটা, বাঁকানো, জোড়া লাগানো থেকে শুরু করে নৌকার শেষ আকৃতি দেওয়া—সবকিছুতেই প্রয়োজন অভিজ্ঞ হাতের। সেই হাতের দক্ষতাই শতবর্ষের এই ঐতিহ্যকে এখনো ধরে রেখেছে।
নৌকার হাটের পাশেই ভাসমান পেয়ারার বাজার
আটঘর-কুড়িয়ানা এলাকার পরিচিতির সঙ্গে নৌকার হাটের পাশাপাশি জড়িয়ে আছে ভাসমান পেয়ারা ও কৃষিপণ্যের বাজার। বর্ষায় খালের বিস্তীর্ণ অংশজুড়ে নৌকায় নৌকায় বসে পেয়ারার বেচাকেনা। চারপাশের সবুজ, পানিতে ভাসমান নৌকা আর কৃষিপণ্যের সমাহার তৈরি করে ভিন্ন এক দৃশ্য।
এই জলজ জীবন দেখতে বর্ষাকালে বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরাও আসেন। কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগান ও কুড়িয়ানা পেয়ারা বাজারকে সরকারি পর্যায়ে পর্যটন স্পট হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top