প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন: পর্যটনে ফিরছে গতি, জেটি নিয়ে গভীর উৎকণ্ঠা



দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার জমে উঠছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের পর্যটন শিল্প। আগামী নভেম্বর থেকেই দ্বীপে পর্যটক চলাচলের জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই খবরে দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা স্থানীয় ব্যবসায়ী ও দ্বীপবাসীর মাঝে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। তবে পর্যটন মৌসুমের ঠিক মুখেই দ্বীপে ওঠানামার একমাত্র জেটি ও পন্টুনের জীর্ণদশা নিয়ে চরম শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নভেম্বরেই খুলছে দুয়ার, চূড়ান্ত প্রস্তুতির ব্যস্ততা
সম্প্রতি সচিবালয়ে পরিবেশ মন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সেন্টমার্টিনের পর্যটন উন্মুক্তকরণ নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। উক্ত সভায় টেকনাফ থেকে নৌযান চলাচল এবং দৈনিক চার হাজার পর্যটকের যাতায়াতের সুযোগ রেখে চার থেকে পাঁচ মাস পর্যটন মৌসুম সচল রাখার জোর প্রস্তাব করা হয়।
যদিও জাহাজ চলাচলের সুনির্দিষ্ট রুট ও চূড়ান্ত নির্দেশনার বিষয়ে প্রশাসনিক ঘোষণা এখনো বাকি, তবুও দ্বীপে থেমে নেই প্রস্তুতি। সেন্টমার্টিনের দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁয় এখন চলছে মেরামত, ধোয়া-মোছা ও নতুন রূপে সাজিয়ে তোলার তোড়জোর।
ব্যবসায়ীদের স্বস্তি ও অর্থনৈতিক ঘুরে দাঁড়ানোর আশা
বিগত সময়ে পর্যটন নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি ও যাতায়াত বন্ধ থাকায় সেন্টমার্টিনের অর্থনীতি মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। দ্বীপের বহু মানুষের জীবিকা সরাসরি এই খাতের ওপর নির্ভর করায় আসন্ন মৌসুমকে ঘিরে তারা আবার ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন।
দ্বীপের হোটেল ব্যবসায়ী জাহিদ মল্লিক বলেন, “আমাদের সারা বছরের রুটি-রুজি নির্ভর করে মাত্র দুই-তিন মাসের এই পর্যটন মৌসুমের ওপর। যাতায়াত বন্ধ থাকায় রিসোর্টগুলোর প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, যা এখন সংস্কার করা হচ্ছে। আনন্দের বিষয় হলো, ইতোমধ্যে পর্যটকদের কাছ থেকে আগাম বুকিংয়ের ইতিবাচক সাড়াও মিলছে।”
ঝুঁকিপূর্ণ জেটি ও নিরাপত্তা শঙ্কা
পর্যটন দুয়ার খোলার আনন্দের মাঝেও সেন্টমার্টিনের একমাত্র পন্টুন ও জেটির করুণ দশা চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে স্থানীয়দের কপালে। প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন এই জেটির মূল কাজ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, ইতোমধ্যেই পন্টুনে মরিচা ধরে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। পর্যটন মৌসুম শুরু হলে হাজার হাজার পর্যটকের ওঠানামায় বড় ধরণের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী। তাদের দাবি, মৌসুম শুরুর আগেই দ্রুততম সময়ে এটি সংস্কারের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
পরিবেশ রক্ষা ও প্রশাসনের নজরদারি
দ্বীপের নাজুক বাস্তুসংস্থান রক্ষা এবং স্থানীয় জীবিকার সংস্থান—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষায় প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করা হয়েছে। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. অণিক চৌধুরী জানান, হোটেল-রিসোর্টের আবেদন যাচাই-বাছাই করে নিয়ম মেনে শ্রমিকদের দ্বীপে যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। একইসঙ্গে পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের সাথে প্রস্তুতিমূলক বৈঠকও সম্পন্ন হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুল হাসান জানান, পর্যটন চলাকালে দ্বীপে পরিবেশগত ক্ষতি রোধে কঠোর পর্যবেক্ষণ থাকবে। পলিথিন ও একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক (সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক) ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বলবৎ রাখা হবে।
উল্লেখ্য, বিগত মৌসুমে সরকারি নীতিমালার কারণে সেন্টমার্টিনে পর্যটকদের রাতযাপনে কড়াকড়ি ছিল এবং দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক ভ্রমণের অনুমতি পেতেন। তবে এবার পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নৌ চলাচলের রুট পুনর্বিন্যাসের নীতিগত আলোচনা চলায় নতুন দিগন্তের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন দ্বীপবাসী ও পর্যটন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top