আপনি সরকারি কিংবা বেসরকারি চাকরি করেন। মাসজুড়ে আপনার আয়ের বড় একটি অংশ কোথায়, কীভাবে খরচ হয়। চলুন, সেই হিসাবটা একটু দেখে নেওয়া যাক। মাসের শুরুতেই সবচেয়ে বড় অঙ্কের খরচটা যায় বাসা ভাড়ায়। এর সঙ্গে যোগ হয় গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ বিল। এরপর মাসজুড়ে খাবার খরচ, যাতায়াত, মোবাইল-ইন্টারনেট বিলসহ থাকে নানা টুকিটাকি ব্যয়।
এভাবেই একের পর এক খরচ সামলাতে গিয়ে মাসের শেষদিকে অনেক চাকরিজীবীকে পড়তে হয় ‘মধুর’ এক সমস্যায়। বেতন হাতে আসার আগেই শেষ হয়ে যায় টাকার বড় একটি অংশ। আর নতুন মাসের বেতন পাওয়ার পর সেটিও চলে যায় আগের মাসের ধার-দেনা পরিশোধে। ফলে মাস শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে বাড়তে থাকে দুশ্চিন্তা।
তবে সঠিক পরিকল্পনা ও কৌশল অনুসরণ করলে ব্যয়ের তালিকা কমানোর পাশাপাশি সঞ্চয়ের পরিমাণও বাড়ানো সম্ভব। আপনার বেতন থেকে আরও ভালোভাবে সঞ্চয় করতে সহায়তা করবে এমন ১০টি বাস্তবসম্মত উপায় নিচে তুলে ধরা হলো।
সঠিক অর্থ ব্যবস্থাপনার প্রথম ধাপ হলো বাজেট তৈরি করা। শুরুতেই আয়ের সব উৎস এবং মাসিক খরচের তালিকা তৈরি করুন। বাড়িভাড়া বা অন্যান্য নির্দিষ্ট খরচের পাশাপাশি বাইরে খাওয়া, বিনোদনসহ পরিবর্তনশীল ব্যয়ও এতে অন্তর্ভুক্ত করুন। এতে কোন খাতে খরচ কমানো সম্ভব এবং প্রতি মাসে বাস্তবসম্মতভাবে কত টাকা সঞ্চয় করা যায়, তা সহজেই বুঝতে পারবেন।
সঞ্চয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
নির্দিষ্ট ও পরিমাপযোগ্য সঞ্চয়ের লক্ষ্য ঠিক করলে আর্থিক পরিকল্পনা মেনে চলা সহজ হয়। বাড়ি কেনার অগ্রিম, স্বপ্নের ভ্রমণ কিংবা অবসরের জন্য সঞ্চয়—লক্ষ্য যাই হোক, নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য থাকলে অর্থের অগ্রাধিকার ঠিক করা যায়। একই সঙ্গে সঞ্চয়ের বিষয়টিও আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
আলাদা সঞ্চয়ী হিসাব খুলুন
সঞ্চয়ের টাকা খরচের অর্থ থেকে আলাদা রাখতে একটি পৃথক সঞ্চয়ী হিসাব খুলুন। এমন হিসাব বেছে নিন, যেখানে তুলনামূলক বেশি সুদের পাশাপাশি কম ফি রয়েছে। এতে সঞ্চয়ের অর্থ থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া সম্ভব। আলাদা হিসাবে টাকা রাখলে অপ্রয়োজনে খরচ করার প্রবণতাও কমে এবং ধীরে ধীরে সঞ্চয়ের পরিমাণ বাড়তে থাকে।
এছাড়াও প্রতি মাসে আলাদা করে সঞ্চয়ের কথা মনে রাখার ঝামেলা এড়াতে প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয় করে দিতে পারেন। বেতন পাওয়ার পরপরই মূল হিসাব থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সঞ্চয়ী হিসাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করুন। অর্থ ব্যবস্থাপনায় এটিকে ‘আগে নিজেকে পরিশোধ করুন’ পদ্ধতি বলা হয়। এতে মাস শেষে অবশিষ্ট টাকা থেকে সঞ্চয় করার পরিবর্তে বেতন পাওয়ার পরই সঞ্চয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
কোথায় কত খরচ করছেন, হিসাব রাখুন
আপনার অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে, তার ওপর নিয়মিত নজর রাখুন। এজন্য বাজেট তৈরির অ্যাপ কিংবা সাধারণ স্প্রেডশিট ব্যবহার করে প্রতিটি কেনাকাটা ও বিলের হিসাব লিখে রাখতে পারেন। এ অভ্যাসের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। পরে সেই অর্থ সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মাসিক বিল কমানোর চেষ্টা করুন
প্রতি মাসের বিভিন্ন বিল পর্যালোচনা করে যেখানে সম্ভব খরচ কমানোর চেষ্টা করুন। ইন্টারনেট, কেবল টিভি বা মোবাইল ফোনের মতো সেবার ক্ষেত্রে কম খরচের প্যাকেজ নেওয়া কিংবা সেবাদাতার সঙ্গে নতুন শর্তে চুক্তির সুযোগ আছে কি না, তা যাচাই করুন। প্রয়োজন হলে কম খরচের অন্য সেবাদাতার কাছেও যেতে পারেন। পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও অন্যান্য ইউটিলিটি ব্যবহারের পরিমাণও নিয়মিত পর্যালোচনা করুন। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও মাসিক খরচ কমানো সম্ভব।
বাসায় রান্না করা খাবার খেতে পারেন
বাইরে খাওয়ার পরিবর্তে বাড়িতে রান্না করলে খাবারের পেছনে খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। প্রতি সপ্তাহের খাবারের পরিকল্পনা করে বাজারের তালিকা তৈরি করুন এবং সেই তালিকা অনুযায়ী কেনাকাটা করুন। একসঙ্গে বেশি পরিমাণ খাবার তৈরি করে রাখলেও সময় ও অর্থ, দুটিই সাশ্রয় করা সম্ভব। পাশাপাশি ঘরে তৈরি খাবার সাধারণত স্বাস্থ্যকরও হয়ে থাকে।
গণপরিবহন ব্যবহার করুন
ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করলে জ্বালানি, গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও পার্কিংয়ের খরচ কমানো সম্ভব। প্রতিদিন গাড়ি ব্যবহারের মোট খরচের সঙ্গে মাসিক গণপরিবহনের পাস বা ভাড়ার তুলনা করুন। আপনার যাতায়াতের ধরন ও জীবনযাপনের সঙ্গে কোনটি বেশি সাশ্রয়ী, তা সহজেই বুঝতে পারবেন।
হঠাৎ কেনাকাটা এড়িয়ে চলুন
অপ্রয়োজনীয় বা হঠাৎ কেনাকাটা বাজেট নষ্ট করার অন্যতম কারণ। তাই কেনাকাটার আগে প্রয়োজনীয় পণ্যের তালিকা তৈরি করুন এবং সেই তালিকা অনুযায়ী কেনাকাটা করুন। বড় কোনো পণ্য কেনার ক্ষেত্রে অন্তত ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করুন। এতে আবেগের বশে কেনাকাটার প্রবণতা কমবে এবং পরে আফসোস হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যাবে। পাশাপাশি অনলাইনে বিভিন্ন দোকানের দাম তুলনা করে সবচেয়ে ভালো দামে পণ্য কেনার চেষ্টা করুন।
বেশি সুদের ঋণ দ্রুত পরিশোধ করুন
ক্রেডিট কার্ডের বকেয়া বা স্বল্পমেয়াদি উচ্চ সুদের ঋণের মতো দেনা দ্রুত শোধ করাকে অগ্রাধিকার দিন। এসব ঋণের সুদ দ্রুত বাড়তে পারে, যা আপনার সঞ্চয়ের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। তাই হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে তা দিয়ে উচ্চ সুদের ঋণ দ্রুত পরিশোধের চেষ্টা করুন। এতে মোট সুদের পরিমাণ কমবে এবং ভবিষ্যতে সঞ্চয়ের জন্য আরও বেশি অর্থ হাতে থাকবে।