সাম্প্রতিক
র‍্যাবের অভিযানে কালীগঞ্জে ৫৯৪ বোতল ফেন্সিডিলসহ এক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার মুক্তাগাছা পৌরসভা পরিদর্শনে ডিডিএলজি ময়মনসিংহ ধর্ষণের পর শিশু হত্যা: নড়াইলে উত্তেজিত জনতার গণ ধোলাইয়ের পর আটক নির্মাণ শ্রমিক রবি বিকেলে বাবার দাফন, রাতে এটিএম বুথে ডিউটি, সকালে এইচএসসি পরীক্ষা প্রধানমন্ত্রীর কাছে ‘ভালোকে ভালো, খারাপকে খারাপ’ বলার স্বাধীনতা চাইলেন জুলাইযোদ্ধা নাসির কুষ্টিয়ায় মাদ্রাসায় ছাত্রকে বলৎকারের অভিযোগে শিক্ষক আটক ‘দুই দিন ধরে ভাত খাইনি’ বলার পর গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু ‘আল্লাহ যদি কিয়ামতে জান্নাত দেওয়া আরম্ভ করে প্রথমেই সাতক্ষীরা দিয়ে শুরু করবে’ ওরে নিয়ে আমি একবারই এসেছি: জামায়াতের ভাইরাল এমপি নজরুল ককরোচরা দিল্লি হাইকোর্টকেও বিপদে ফেলল

ককরোচ জনতা পার্টির এবং কৃষকদের আন্দোলনের ধাক্কায় চ্যালেঞ্জের মুখে মোদি সরকার

একদিকে ভারতের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি রক্ষার তাগিদে পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তে অবরুদ্ধ কৃষকদের ‘দিল্লি চলো’ হাঁক, অপরদিকে প্রশাসনিক নীতি ও ব্যবস্থার প্রতিবাদে তরুণ ও নাগরিক সমাজের অভিনব ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ আন্দোলন— এই দুইয়ের ধাক্কায় দিল্লি এখন এক চরম দ্বিমুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে। চাপের মুখে মোদি সরকার।

প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বহুমাত্রিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে আয়োজিত ‘কিষাণ মহাপঞ্চায়েতে’ যোগ দিতে যাওয়ার পথে ফের অবরুদ্ধ হয়েছেন পাঞ্জাবের শত শত কৃষক। মঙ্গলবার পাঞ্জাব থেকে যাত্রা শুরু করা এই কৃষক বহরকে পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তের শম্ভু সীমানায় আটকে দিয়েছে হরিয়ানা পুলিশ।

সীমান্তেই প্রতিবাদ মঞ্চ, রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ

দিল্লিতে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা শম্ভু সীমান্তকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রতিবাদ স্থান বানিয়ে বসে পড়েছেন। পাঞ্জাব ও হরিয়ানা—উভয় সরকারের বিরুদ্ধে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার ও সমাবেশের স্বাধীনতা দমনের অভিযোগ এনেছেন কৃষক নেতারা।

বিকেইউ (শহীদ ভগৎ সিং) নেতা তেজবীর সিং অভিযোগ করেন, হরিয়ানা পুলিশ অন্যায়ভাবে পাঞ্জাবের ভূখণ্ডের ভেতরে ঢুকে ব্যারিকেড তৈরি করেছে, আর পাঞ্জাব সরকার বাধা না দিয়ে ‘নীরব দর্শক’ হয়ে রয়েছে। তবে পাঞ্জাবের বহর আটকে দেওয়া হলেও হরিয়ানার আম্বালা, কুরুক্ষেত্র ও পার্শ্ববর্তী এলাকার কৃষকরা কিন্তু দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।

কেন এই প্রতিবাদ? ভারত-মার্কিন চুক্তির পেছনের ভয়

‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের একাধিক কৃষক সংগঠন একযোগে এই আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। কিষাণ মজদুর সংঘর্ষ কমিটির (কেএমএসসি) নেতা সারওয়ান সিং পান্ধের জানান, চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ২০২৬ সালের শরতের মধ্যেই প্রথম ধাপের বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করা হবে।

কৃষক নেতাদের দাবি, এটি কোনো সাধারণ বাণিজ্য চুক্তি নয়। এতে ভারতের কৃষি, ডেইরি বা দুগ্ধশিল্প, শিল্প খাত, ডিজিটাল বাণিজ্য, ই-কমার্স, মেধা সম্পত্তি অধিকার এবং পরিষেবা খাতের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় যুক্ত রয়েছে।

ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর প্রভাবের শঙ্কা

মার্কিন পণ্যে ছাড়: যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিবেদনে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের বাজারে আমেরিকান সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, আপেল, বাদাম, দুগ্ধজাত পণ্য ও হাঁস-মুরগির মাংসের ওপর শুল্ক কমানোর চাপ দেওয়া হচ্ছে।

অসম প্রতিযোগিতা: যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি ও ডেইরি খাতে সরকার বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেয়। আমেরিকান সস্তা পণ্য ভারতীয় বাজারে প্রবেশ করলে ভারতের লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে দেউলিয়া হয়ে পড়বেন।

৮ কোটি পরিবার ঝুঁকিতে: ভারতের দুগ্ধ খাতের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৮ কোটি গ্রামীণ পরিবার নির্ভরশীল। কৃষক সংগঠনগুলোর মতে, এই খাতে আঘাত লাগলে পুরো গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প তছনছ হয়ে যাবে।

স্বচ্ছতার দাবি ও আল্টিমেটাম

চুক্তি সংক্রান্ত নথিপত্র গোপন রাখা হচ্ছে অভিযোগ তুলে ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’ দাবি জানিয়েছে, কেন্দ্র সরকারকে অনতিবিলম্বে ভারত-মার্কিন প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তির সমস্ত নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। কৃষক, দুগ্ধ উৎপাদক, শ্রমিক ও মূল অংশীদারদের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও সম্মতি ছাড়া যেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনও চুক্তিতে স্বাক্ষর না করা হয়— এমনই স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে কিষাণ মোর্চা।

প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে আন্দোলন

সিজেপির আন্দোলনের প্রধান ইস্যু হয়ে ওঠে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট (এনইইটি)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস। দলটির অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালীদের কাছে প্রশ্ন বিক্রি হওয়ায় লাখো শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

ভারতে প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী মাত্র ১ লাখ ৩০ হাজার মেডিকেল আসনের জন্য প্রতিযোগিতা করেন। অনেক পরিবার সন্তানদের কোচিং করাতে সঞ্চয় ব্যয় করে বা ঋণ নেয়। প্রশ্নফাঁসের কারণে অনেক শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষা দিতে হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঘটনায় হতাশ হয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কয়েক ডজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

এই পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে দেশজুড়ে জনসমর্থন গড়ে তোলে সিজেপি।

দিল্লিতে বিক্ষোভ, যুক্ত হন সোনম ওয়াংচুক

জুনের শুরুতে দিল্লিতে প্রথম বড় কর্মসূচি পালন করে সিজেপি। মাসের শেষ দিকে দ্বিতীয় দফায় বিক্ষোভ শুরু করে তারা। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এই কর্মসূচিতে যোগ দেন লাদাখের প্রকৌশলী ও শিক্ষা অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। তিনি শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেন এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত তা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন।

অনশন ও পুলিশি পদক্ষেপ

দুই সপ্তাহের বেশি সময় অনশন চলার পর ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে আদালত তার স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের নির্দেশ দেন। পরে অনশনের ২০তম দিনে দিল্লি পুলিশ তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পুলিশ এটিকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার পদক্ষেপ বললেও তার পরিবার ঘটনাটিকে বেআইনি আটক বলে দাবি করে।

হাসপাতাল থেকেই ওয়াংচুক সমর্থকদের সংসদ অভিমুখে পদযাত্রার আহ্বান জানান।

সংসদমুখী বিক্ষোভ

সোমবার (২০ জুলাই) সিজেপির ডাকে হাজারো মানুষ মধ্য দিল্লিতে জড়ো হন। আগের রাত থেকেই অনেক আন্দোলনকারী অবস্থান নেন। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রশ্নপত্র ফাঁসে ক্ষতিগ্রস্তদের অভিভাবকেরাও বিক্ষোভে অংশ নেন।

দিল্লি পুলিশ সংসদমুখী পদযাত্রার অনুমতি না দিয়ে বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসায় এবং কিছু এলাকায় ইন্টারনেট সেবা সীমিত করে। এরপরও দুপুরের আগেই ২০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভস্থলে জড়ো হন।

পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এতে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হন। অভিজিৎ দীপকে পুলিশের এই পদক্ষেপকে ‘অত্যন্ত নিষ্ঠুর’ বলে মন্তব্য করেন।

আলোচনায় অগ্রগতি নেই

সোমবার সরকার সিজেপির প্রতিনিধিদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করে। সেখানে দলটির পক্ষ থেকে তিন দফা দাবি তুলে ধরা হলেও সরকার কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি বলে জানান সিজেপির মুখপাত্র। সিজেপির প্রধান মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, আমাদের দাবি হলো-সোনম ওয়াংচুককে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হবে এবং প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এসব দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না।

এদিকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। গভীর রাতে পুলিশ বিক্ষোভস্থল খালি করার চেষ্টা করলেও আন্দোলনকারীরা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে সিজেপি লিখেছে, ‘এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শেষ হচ্ছে না।’

Tags:

সম্পর্কিত খবর :