গ্রামীণফোনের অডিট থামানোর আবেদন নাকচ

মঙ্গলবার,৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোনের কার্যক্রম যাচাইয়ে অডিট করার উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের নতুন এ অডিট শুরুর আগেই বিটিআরসির এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন এবং নানা আপত্তি তুলে স্থগিতের আবেদন করে গ্রামীণফোন। তবে অডিট কার্যক্রম স্থগিত করার গ্রামীণফোনের সেই আবেদন নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। একই সঙ্গে দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটরটিকে চলমান অডিট কার্যক্রমে পূর্ণ সহযোগিতা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত, নথিপত্র ও সিস্টেমে প্রবেশাধিকার (অ্যাকসেস) দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সংস্থাটি। নতুন অডিট কার্যক্রম (২০১৫-২০২৪) স্থগিতের আবেদন পর্যালোচনা শেষে গ্রামীণফোনকে দেওয়া এক চিঠিতে বিটিআরসি এসব নির্দেশনা দিয়েছে। গতকাল রোববার সংস্থাটির উপপরিচালক মো. মঈদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিটি গ্রামীণফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) বরাবর পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বিটিআরসি জানিয়েছে, গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে অডিট স্থগিত করার আবেদন এবং এ বিষয়ে পাঠানো বিভিন্ন চিঠি পর্যালোচনা করেছে কমিশন। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বর্তমান অডিট কার্যক্রম ১৯৯৭-২০১৪ সময়কালের অডিট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং স্বতন্ত্র। ফলে এটি কোনো বিচারাধীন (সাব-জুডিস) বিষয়ের আওতায় পড়ে না।

এ কারণে চলমান অডিট কোনো বিচারাধীন (সাব-জুডিস) বিষয়ের আওতায় পড়ে না বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। ফলে অডিট কার্যক্রম স্থগিত রাখার পক্ষে গ্রামীণফোনের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। বিটিআরসি জানিয়েছে, অডিটের পরিধি (স্কোপ অব অডিট), কার্যপরিধি (টার্মস অব রেফারেন্স-টিওআর) এবং সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া এরই মধ্যে গ্রামীণফোনকে অবহিত করা হয়েছে। টেলিযোগাযোগ আইন, ২০০১ এবং মোবাইল অপারেটর লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী কমিশন যে কোনো সময় লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক, আর্থিক ও কমপ্লায়েন্স অডিট পরিচালনা এবং অপারেটরদের কাছ থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্য চাওয়ার এবং বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারির ক্ষমতা রাখে, একজন লাইসেন্সধারী হিসেবে গ্রামীণফোন এ বিষয়ে অবগত।

নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি বলেছে, অডিটের অংশ হিসেবে অপারেটরটির মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা, শ্রম আইন পরিপালন এবং কর্মীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানের বিষয়ও যাচাই করা হবে। বিশেষ করে মানবসম্পদ নীতিমালা বাংলাদেশের শ্রম আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, কর্মচারীদের প্রকৃতপক্ষে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কি না এবং তাদের প্রাপ্য সুবিধা যথাযথভাবে প্রদান করা হয়েছে কি না—এসব বিষয় পর্যালোচনা করা হবে।

বিটিআরসি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লাইসেন্সের শর্ত এবং বিদ্যমান আইন অনুসারে এ ধরনের তথ্য যাচাই করার পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। এ অবস্থায় গ্রামীণফোনের আপত্তি নাকচ করে অডিট কার্যক্রমে পূর্ণ সহযোগিতা করতে এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য, নথিপত্র ও সিস্টেম অ্যাকসেস জমা দিতে বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন এ অডিটকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাস ধরে গ্রামীণফোন ও বিটিআরসির মধ্যে চিঠি চালাচালি চলছিল। অপারেটরটির পক্ষ থেকে অডিটের পরিধি ও কিছু বিষয় নিয়ে আপত্তি জানিয়ে কার্যক্রম স্থগিতের আবেদন করা হলেও সর্বশেষ চিঠিতে বিটিআরসি স্পষ্ট করেছে, আইন ও লাইসেন্সের বিধান অনুযায়ী অডিট কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং এ বিষয়ে অপারেটরকে সহযোগিতা করতেই হবে।

এর আগে গত ১৮ মে ‘বিটিআরসি অডিট করুক চায় না গ্রামীণফোন’ শিরোনামে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালবেলা। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫-২০২৪ সময়ের জন্য ‘অপারেটরস প্রসিডিউর অ্যান্ড সিস্টেমস অডিট’ শুরুর আগেই এর পরিধি, আইনগত ভিত্তি, তথ্য যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং নিরীক্ষকদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে গ্রামীণফোন। চিঠিতে অপারেটরটি দাবি করে, কর, বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তর, শ্রম আইন, শেয়ার লেনদেন ও মানবসম্পদ নীতিমালার মতো বিষয় বিটিআরসির নিয়ন্ত্রক এখতিয়ারের বাইরে। একই সঙ্গে অডিট স্থগিত রেখে আলোচনায় বসার আহ্বান জানায় মোবাইল অপারেটরটি।

তবে বিটিআরসি শুরু থেকে বলে আসছিল, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ও লাইসেন্স শর্ত অনুযায়ী যে কোনো সময় লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক, আর্থিক ও কমপ্লায়েন্স অডিট করার পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন অডিট নিয়ে গ্রামীণফোনের আপত্তির পেছনে পুরোনো অডিটের অভিজ্ঞতাও কাজ করছে। ১৯৯৭ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সময়ের ওপর পরিচালিত ইনফরমেশন সিস্টেম অডিটে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে রাজস্ব ফাঁকি, আর্থিক অসংগতি ও লাইসেন্স শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে বিটিআরসি।

সেই অডিটের ভিত্তিতে বিটিআরসি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মিলিয়ে অপারেটরটির কাছে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা দাবি করা হয়। এর মধ্যে বিটিআরসির দাবির পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা। বিষয়টি নিয়ে এখনো বিরোধ নিষ্পত্তি হয়নি, দীর্ঘদিন ধরে আইনি ও প্রশাসনিক বিরোধ চলমান রয়েছে।

বিটিআরসি সংশ্লিষ্টরা বলছে, অডিট প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করতেই প্রশ্ন তুলছে গ্রামীণফোন। কারণ বিটিআরসি যে কোনো সময় লাইসেন্সধারীদের নিয়ন্ত্রক, আর্থিক এবং পরিপালন অডিট পরিচালনা করতে যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত, যা লাইসেন্সধারী হিসেবে গ্রামীণফোন ভালোভাবেই অবগত। আর এ অডিটের সার্বিক কার্যপ্রণালিও এরই মধ্যে গ্রামীণফোনকে জানানো হয়েছে। এরপরও স্থগিত করার আবেদন অডিট প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্য হিসেবে দেখছে বিটিআরসি।

কালবেলায় প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বিটিআরসি জানিয়েছিল, অপারেটর কার্যপ্রণালি ও সিস্টেম অডিট-সংক্রান্ত বিষয়ে গ্রামীণফোন লিমিটেড কর্তৃক দাখিলকৃত চিঠিতে উত্থাপিত বিষয়গুলো কমিশন পর্যালোচনা করেছে। বর্তমান অডিটটি বিচারাধীন বলে দাবীকৃত কোনো বিষয়ের আওতাভুক্ত নয়। এ ছাড়া অডিটের পরিধি, কার্যপরিধি (টিওআর) এবং প্রাসঙ্গিক কার্যপ্রণালি এরই মধ্যে গ্রামীণফোনকে জানানো হয়েছে। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১ এবং মোবাইল অপারেটর লাইসেন্সের শর্তাবলি অনুসারে, বিটিআরসি যে কোনো সময় লাইসেন্সধারীদের নিয়ন্ত্রক, আর্থিক এবং পরিপালন অডিট পরিচালনা করতে যথাযথভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত।

সংস্থাটি থেকে বলা হয়, গ্রামীণফোন সামগ্রিক অডিট প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের প্রশ্ন উত্থাপন করছে, যা গ্রামীণফোনের মতো একটি লাইসেন্সপ্রাপ্ত অপারেটরের কাছ থেকে প্রত্যাশিত বা কাম্য নয়। কমিশন প্রত্যাশা করে, গ্রামীণফোন নিরীক্ষা প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা করবে এবং নিরীক্ষার শর্তাবলি অনুযায়ী সময়মতো সব প্রয়োজনীয় তথ্য, নথি ও সিস্টেম অ্যাক্সেস জমা দেওয়া নিশ্চিত করবে।

Tags:

সম্পর্কিত খবর :