সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর-কালীগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের আপত্তিকর ভিডিও নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা অব্যাহত আছে। এ নিয়ে গত দুদিন মূলধারার গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ধারাবাহিক সংবাদ পরিবেশন হচ্ছে। তিনবার নির্বাচিত এই বয়োবৃদ্ধ এমপির সঙ্গে এক তরুণীর এমন সম্পর্ককে অনেকে অনেকভাবে বিশ্লেষণ করছেন। যদিও গাজী নজরুল এবং তার প্রথম পক্ষের স্ত্রী মাকসুদা ইসলামের দাবি— ওই তরুণীর সঙ্গে এমপির বৈবাহিক সম্পর্ক রয়েছে। মেয়েটির বাবাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তাদের সম্পর্ক বৈধ হলে লুকোচুরি কেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সে প্রশ্নও তুলেছেন কেউ কেউ। আবার অসম বিয়ের বিষয়টিকেও ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন অনেকে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) মধ্যরাত থেকে ভাইরাল হওয়া কয়েকটি ভিডিও গত দুই দিন ধরে ব্যাপক শেয়ার হচ্ছে। পরিণত হয়েছে ট্ক অব দ্য কান্ট্রিতে। বুধবার (২২ জুলাই) তার নিজ নির্বাচনি এলাকায় তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়েছে। সচেতন নাগরিকের ব্যানারে ঝাড়ু মিছিল থেকে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।
এরই মধ্যে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। এতে উল্লেখ করা হয়—প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘‘গাজী নজরুলের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন দলের হাইকমান্ড। দোষী প্রমাণ হলে তাকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হতে পারে।’’ তবে দল থেকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত এলে গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদের কী হবে, সেই আলোচনাও সামনে আসছে।
সংবিধানের ধারায় কী আছে?
সাধারণত কোনও সংসদ সদস্য অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায়ে অভিযুক্ত হলে তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কী থাকবে না, এমন প্রশ্ন সামনে চলে আসে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তফা শাকের উল্লাহ বলেন, ‘‘কোনও ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হওয়া, নৈতিক বিতর্ক তৈরি হওয়া, সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা বা অভিযোগ ওঠার কারণে সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার কোনও বিধান নেই। সংবিধানে এমন কোনও অনুচ্ছেদ নেই, যেখানে শুধু অভিযোগ বা নৈতিক সমালোচনার ভিত্তিতে সরাসরি সদস্যপদ বিলুপ্তি হবে।’’
তবে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য পদ তখনই শূন্য হয়, যদি কোনও সদস্য যে রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন, অথবা সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দেন।
ব্যারিস্টার মোস্তফা শাকের উল্লাহ বলেন, ‘‘দলীয় বহিষ্কার বা সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হলে ৭০ অনুচ্ছেদের অধীনে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হওয়ার সুযোগ নেই।’’
তবে ফৌজদারি মামলায় তিনি যদি এমনভাবে দণ্ডিত হন, যাতে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও প্রাসঙ্গিক আইনের অধীনে তিনি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েন, তখন বিষয়টি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হবে। আসন শূন্য হওয়ার প্রশ্ন দেখা দিলে সংবিধানের ৬৭(২) অনুযায়ী বিষয়টি রাষ্ট্রপতির নিকট যাবে এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনের মতামত গ্রহণ করে সিদ্ধান্ত দেবেন।’’
এ ক্ষেত্রে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ আইনগত ও সাংবিধানিকভাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঝুঁকির মুখে নয়। দল তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, এমনকি বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিলেও, শুধু সেই কারণে তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হবে না। তবে তিনি যদি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেন (সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ), অথবা পরবর্তীকালে এমন কোনও আইনগত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, যাতে তিনি সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ ও প্রযোজ্য আইনের অধীনে সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েন, তাহলে সংবিধানে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তার সদস্য পদের প্রশ্ন নিষ্পত্তি হবে জানান ব্যারিস্টার শাকের।
জামায়াতের ব্যাখ্যা
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এক তরুণীর ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মঙ্গলবার (২১ জুলাই) বিকালে গণমাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে তার দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এতে দলটির কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের উল্লেখ করেন, বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে গাজী নজরুল ইসলামের নিজের বক্তব্য, তার প্রথম ও দ্বিতীয় স্ত্রী এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর বাবার ভিডিও বক্তব্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘‘বিষয়টি নিয়ে আরও খোঁজ-খবর ও প্রকৃত ঘটনার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’’
গাজী নজরুল বহিষ্কার হচ্ছেন?
জামায়াতের দলীয় সূত্র জানিয়েছে, কোনও নেতার বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত বা সংগঠনবিরোধী অপরাধ প্রমাণ হলে গঠনতন্ত্রের পঞ্চম অধ্যায়ের ৬২ ধারায় প্রথমে তার প্রাথমিক সদস্য পদ বাতিল করার নিয়ম আছে। পরবর্তীকালে তাকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কারও করা হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক নেতা জানান, গাজী নজরুল ইস্যুতে জামায়াতের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল সর্বস্তরের জনশক্তি চরমভাবে বিব্রত। কারণ ইতোপূর্বে দলটির এই মানের কোনও নেতার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ আসেনি বলে দাবি তার। তাই দল থেকে বহিষ্কারের পাশাপাশি তাকে সংসদ সদস্য পদ থেকেও পদত্যাগের বিষয়ে চাপ প্রয়োগ করা হতে পারে বলে তিনি জানান।
জানতে চাইলে দলটি সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘‘কোনও নেতা বা জনশক্তির অপরাধ প্রমাণ হলে মাত্রা অনুযায়ী জামায়াত সব সময়েই ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। সাতক্ষীরার এমপি গাজী নজরুলের বিষয়টি নিয়ে আমাদের তদন্ত চলছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সত্যিই যদি তিনি বহিষ্কার হন, তার সংসদ সদস্য পদের কী হবে এমন প্রশ্নে হামিদুর রহমান বলেন, ‘‘সেটির আইনগত দিক খতিয়ে দেখে দলগত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।’’
এমপি পদ নিয়ে যা বললেন চিফ হুইপ
সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতের দলীয় সংসদ সদস্য গাজী নজরুলের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে বলেন, ‘‘বিষয়টি গণমাধ্যম থেকে জেনেছি। আসলে ঘটনাটি সঠিক কিনা, তা নিশ্চিত নই। তিনি কারও ষড়যন্ত্রের শিকারও হতে পারেন। তারপরও বলবো, তিনি যদি অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে আদালত সেটি দেখবে। এরপর ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন। তবে তিনি তার দল থেকে পদত্যাগ করলে, আসনটি শূন্য ঘোষণা হবে। সে ক্ষেত্রে ৯০ দিনের মধ্যে উপনির্বাচন সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।’’












