২০২৪ সালের ১লা জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে যৌক্তিক কোটা সংস্কারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসে। সেই আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় অধিকার আদায়ের এক বৃহৎ গণআন্দোলনে।
জুলাই আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে যুব শক্তি তারাকান্দা উপজেলা শাখার সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব আনিসুর রহমান বলেন, “আন্দোলনের শুরুতে আমি গাজীপুরের হোতাপাড়ায় অবস্থান করছিলাম। প্রতিদিন গাজীপুর চৌরাস্তা, জয়দেবপুর, কোনাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকার পরিস্থিতির খোঁজ রাখতাম।”
তিনি জানান, আন্দোলনের শুরুতে তিনি তাঁর ফুফাতো ভাই ইউনুস শেখের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ইউনুস তখন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। আনিসুর রহমান বলেন, “আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমাদের ওখানে আন্দোলনের অবস্থা কেমন। সে জানায় আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। তখন আমি বলেছিলাম, আমিও তোমাদের সঙ্গে যুক্ত হব।”
দুই দিন পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইউনুস শেখ তাকে জানান, আবু সাঈদসহ অনেক শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর এবং ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর ঘটনা। সেই খবর শুনে আনিসুর রহমান আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তিনি বলেন, “পরদিন সকালে আমি ইউনুস ভাইয়ের বাসায় যাই এবং তাকে সঙ্গে নিয়ে গাজীপুর চৌরাস্তার দিকে বের হয়ে পড়ি। তখন পরিস্থিতি ছিল খুবই ভয়াবহ। কোনাবাড়ী, জয়দেবপুরসহ বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার সঙ্গে একাত্ম হয়ে আন্দোলনে অংশ নিই।”
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আমরা স্লোগান দিয়েছি— ‘তুমি কে, আমি কে, রাজাকার রাজাকার’, ‘কে বলেছে, কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার’। আমাদের চোখের সামনে অনেক ছাত্রের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেছি। চোখের সামনে রক্ত দেখেছি। তখন মনে হয়েছিল— হয়তো আমরা জীবন হারাব, নয়তো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শেষ পর্যন্ত লড়াই করব।”
আনিসুর রহমান জানান, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির ঘোষণা অনুযায়ী আন্দোলন আরও বেগবান হলে গাজীপুরের হোতাপাড়াতেও তারা আন্দোলন শুরু করেন। পাশাপাশি তিনি নিয়মিত ময়মনসিংহ ও তারাকান্দার পরিস্থিতির খোঁজ রাখতেন এবং আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।
তিনি বলেন, “পরিবার থেকে বারবার আন্দোলন থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল। কিন্তু দেশের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাই।”
জুলাই ৩৬ দিনের সেই সময়কে স্মরণ করে তিনি বলেন, “প্রতিটি দিন ছিল আতঙ্ক আর সংগ্রামের। চোখের সামনে রক্ত, লাশ এবং নির্যাতনের দৃশ্য দেখতে হয়েছে। সবসময় মনে হতো— কখন জানি আমাকেও গুলি করে হত্যা করা হয়। তারপরও অধিকার আদায়ের প্রত্যয়ে আমরা রাজপথ ছাড়িনি।”
অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪-এ তৎকালীন সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে আন্দোলনের একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে বলে উল্লেখ করেন আনিসুর রহমান।
তিনি বলেন, “জুলাই শহীদ ও আহত যোদ্ধাদের আত্মত্যাগ আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। আমরা প্রত্যাশা করি, গণহত্যার বিচার, রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং জনগণের প্রত্যাশার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শহীদদের স্বপ্ন পূরণ হবে।”
আজকের এই দিনে তিনি জুলাই আন্দোলনের সকল শহীদ, আহত যোদ্ধা এবং অধিকার সচেতন ছাত্র-জনতার প্রতি গভীর  শ্রদ্ধা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *