হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ওমানের সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকেই বলেন, এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি।

বাকেই বলেন, ওমানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলেও প্রণালিটি দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচলের নিশ্চয়তা মিলবে না। কারণ, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে নিরাপত্তা এখনও বিঘ্নিত হচ্ছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এবং ওমান এ প্রস্তাবের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।

আজ বৃহস্পতিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এদিকে ইরানের সরকারি বার্তা সংস্থা ইরনার প্রতিবেদনে বাঘাইয়ের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করা কারণগুলো এখনো বিদ্যমান। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং অন্যান্য চাপমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। তবে ইরানের এই প্রস্তাব নিয়ে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বা ওমানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হলো হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ সাধারণত এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে তেহরান কার্যত এই নৌপথ সীমিত করে রেখেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং তেলের দামেও ব্যাপক ওঠানামা দেখা যায়। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি খুব দ্রুত হরমুজ প্রণালি খুলে না দেয়, তাহলে দেশটিকে কঠোর পদক্ষেপের মুখে পড়তে হবে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছিলেন, আলোচনা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে আবারও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হতে পারে। তবে ইরান বারবার জানিয়ে আসছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের কোনো আলোচনা চলছে না এবং এমন কোনো পরিকল্পনাও নেই। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত নতুন পথটি স্থায়ী হবে না। এটি দুই থেকে চার মাস পর্যন্ত চালু থাকতে পারে। তবে তিনি এই পথের অবস্থান বা কীভাবে এটি পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি। বাজার পরিস্থিতিতে এর প্রভাবও দেখা গেছে। বৃহস্পতিবার এশিয়ার লেনদেনে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ০ দশমিক ৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ২৪ ডলারে নেমে আসে। বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ইরান জানিয়েছে, আগাম অনুমতি ছাড়া কোনো জাহাজ এই পথ ব্যবহার করতে পারবে না। ইরানের এই নির্দেশ অমান্য করা কয়েকটি জাহাজের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে অন্যতম বড় বিরোধের বিষয় হলো, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের কাছ থেকে ফি নেওয়ার ইরানের পরিকল্পনা। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এক ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান জাহাজে বহন করা পণ্যের মূল্যের ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত ফি নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি নিয়ে আলোচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র অবশ্য কোনো ধরনের ফি নেওয়ার বিরোধিতা করছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তি কার্যকর হলেও হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করা জাহাজগুলোর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে।

এর আগে জুন মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র একটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছিল। এর লক্ষ্য ছিল যুদ্ধ বন্ধ করা, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছানো। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। কূটনৈতিক আলোচনা থেমে যায় এবং উভয়পক্ষ আবার পাল্টাপাল্টি হামলায় জড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীও লোহিত সাগরে সৌদি আরবের কয়েকটি বন্দরের বিরুদ্ধে অবরোধ চালাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালায়। এই সংঘাতের শুরু হওয়া ওই হামলায় ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। পরে তার ছেলে মোজতবা খামেনি তার স্থলাভিষিক্ত হন। তবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এখনো জনসমক্ষে খুব কমই এসেছেন। হামলার সময় তিনিও আহত হয়েছিলেন বলে জানা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *