নোনা জলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে কেটে গেছে দীর্ঘ ১৭টি বছর। কিন্তু দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের মানুষের মন থেকে এখনো মুছে যায়নি ২০০৯ সালের ২৫ মে’র সেই বিভীষিকাময় দিনটি। আজ প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় আইলার ১৭ বছর পূর্তি।
সেদিন দুপুরের জোয়ারে রাক্ষুসে সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ আর শাকবাড়িয়া নদীর বাঁধ ভেঙে হু হু করে লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল লবণাক্ত পানি। মুহূর্তের মধ্যে লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল খুলনার কয়রা উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন। সরকারি খতিয়ানে সে সময় কয়রার ৪১ জন মানুষের মৃত্যুর কথা বলা হলেও, স্থানীয়দের দাবি—প্রকৃত সংখ্যাটা ছিল আরও অনেক বেশি। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল যে, প্রিয়জনের মরদেহ দাফন করার মতো এক টুকরো শুকনো মাটিও অবশিষ্ট ছিল না; বাধ্য হয়ে অনেক লাশ ভাসিয়ে দিতে হয়েছিল নদীতে।
আইলার পরবর্তী কয়েক বছর কয়রাবাসীর কেটেছে বাঁধের ওপর ঝুপড়ি ঘরে, চরম খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকটে। বসতভিটা, ফসলি জমি, মাছের ঘের হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া হাজারো মানুষ তখন এলাকা ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন ঢাকা, চট্টগ্রাম বা পোশাক শিল্পাঞ্চলগুলোতে।
১৭ বছর পর আজ অধিকাংশ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটিতে ফিরে এসেছেন সত্যি, তবে কাটেনি সব ক্ষত। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায়:
আইলার পর অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণ করা হলেও এখনো বেশ কিছু স্কুল-মাদ্রাসা তহবিল সংকটে জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জরাজীর্ণ ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে পাঠদান।
লবণাক্ততার কারণে কয়রার কৃষিজমিতে আগের মতো ফসল ফলে না। সুপেয় পানির সংকট এখানকার নিত্যদিনের সঙ্গী।
কয়রা মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের ফ্রন্টলাইনে থাকা একটি অঞ্চল। আইলার পর ইয়াস, আম্পান, রিমালসহ একাধিক ঘূর্ণিঝড় বারবার আঘাত হেনেছে এই জনপদে। প্রতিবারই মাটির দুর্বল বেড়িবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয় নতুন নতুন এলাকা। ফলে জোড়াতালির বাঁধ নয়, বরং সিডর বা আইলা-সহনশীল টেকসই ‘মহাপ্রাচীর’ বা মেগা-বেড়িবাঁধের দাবি কয়রাবাসীর দীর্ঘদিনের।
কয়রাবাসীর দীর্ঘ ১৭ বছরের চাওয়া একটাই—ত্রাণ নয়,
তারা চান একটি টেকসই ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ, যা তাদের জীবন ও জীবিকাকে সুরক্ষিত রাখবে।
অবশেষে কয়রাবাসীর সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষা ফুরানোর আলো দেখা যাচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কয়রায় আধুনিক ও শক্তিশালী মেগা প্রকল্পের আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ পুরোদমে এগিয়ে চলছে।
প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে পাউবোর দায়িত্বরত কর্মকর্তারা জানান:
প্রথাগত মাটির বাঁধের বদলে এবার সিসি ব্লক এবং আধুনিক প্রকৌশল বিদ্যা ব্যবহার করে বাঁধ টেকসই করা হচ্ছে।
নদী ভাঙন প্রবণ এলাকাগুলোকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করে পাইলিং ও ড্রেজিং করা হচ্ছে।
চলমান এই মেগা প্রকল্পের কাজ ২০২৭ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ শেষ হবে। এটি বাস্তবায়ন হলে উপকূলবাসীর দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময়ের দুর্ভোগের স্থায়ী অবসান ঘটবে এবং অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য ফিরে আসবে।
আইলার ১৭ বছর পূর্তিতে কয়রাবাসীর একটাই আকুতি—২০২৭ সালের ডেডলাইন যেন আর পিছিয়ে না যায়। মেগা প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়ে উপকূল রক্ষা পাবে, নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আবার আলোর মুখ দেখতে সময় নেবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের লাখো মানুষের অস্তিত্ব এখন মিশে আছে এই নির্মাণাধীন বাঁধের ব্লকে ব্লকে।












