দক্ষিণ গাজার একটি স্কুলকে আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। সেই স্কুলের সিঁড়ির নিচের ছোট্ট একটি জায়গায় ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খুলুদ আবু সাহমুদ। ৩৩ বছর বয়সী দুই সন্তানের এই মা চিকিৎসার অভাবে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।

খুলুদ বলেন, ‘চিকিৎসক আমাকে জানিয়েছেন, এই চিকিৎসা আমার শরীর বা অবস্থার জন্য উপযুক্ত নয়। কেমোথেরাপি আমার রোগ মুক্তিতে তেমন কাজে আসেনি। এর কারণে কেবল আমার চুল ও নখ ঝরে গেছে। প্রায় প্রতিদিনই আমার নখের কিছু অংশ খসে পড়ে।’

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও গাজায় প্রয়োজনীয় ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রবেশে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের বিধিনিষেধ অব্যাহত রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যানসারের ওষুধ, কেমোথেরাপির ওষুধ, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যানেস্থেশিয়ার ওষুধ, পরীক্ষাগারের সামগ্রী, রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জাম ও অস্ত্রোপচারের উপকরণ।

জাতিসংঘের সংস্থা ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মধ্যে গাজার প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং চিকিৎসাসামগ্রীর ৬৬ শতাংশ পুরোপুরি মজুতশূন্য হয়ে যায়। গাজায় প্রায় ১১ হাজার ক্যানসার রোগী রয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৪ হাজার রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে পাঠানোর অনুমোদন দেয়া হলেও তারা এখনো বের হওয়ার অপেক্ষায়।

চলতি মাসে গাজার ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিশেষায়িত ক্যানসার চিকিৎসার ওষুধের মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছানোয় স্তন, কোলোরেক্টাল ও গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল ক্যানসার, মাথা ও ঘাড়ের টিউমার এবং সারকোমাসহ বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের কেমোথেরাপি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

গাজা ক্যানসার সেন্টারের পরিচালক চিকিৎসক মুহাম্মদ আবু নাদা বলেন, ‘তীব্র ওষুধ সংকটের কারণে চিকিৎসকদের মেয়াদোত্তীর্ণ কিছু ওষুধও ব্যবহার করতে হয়েছে। এখন সেগুলোও শেষ হয়ে গেছে। ফলে মৃত্যুহার বাড়ছে। কয়েক বছরের মধ্যে গাজায় কেমোথেরাপির ওষুধের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকট চলছে। নতুন রোগী শনাক্ত হলে তাদের দেয়ার মতো চিকিৎসা নেই।’

মানসম্মত চিকিৎসা পদ্ধতির পরিবর্তে চিকিৎসকদের একক ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার কার্যকারিতা কমছে, রোগীদের ফলাফল খারাপ হচ্ছে এবং জটিলতার ঝুঁকি বাড়ছে। ইমিউনোথেরাপির ওষুধেরও সংকট রয়েছে বলে জানান আবু নাদা।ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পরপরই খুলুদের চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে যাওয়ার অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। কারণ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গাজায় নেই। কিন্তু নয় মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি এখনও গাজা ছাড়ার অপেক্ষায়। চিকিৎসকরা তাকে জানিয়েছিলেন, তার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা জর্ডান বা তুরস্কে পাওয়া যাবে এবং গাজায় থেকে তার অবস্থার উন্নতির কোনো সুযোগ নেই।

গাজার রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, মিশর ও জর্ডানের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এসব রোগীকেও ইসরায়েল বা মিশরের নিয়ন্ত্রণাধীন সীমান্ত দিয়ে বের হওয়ার অনুমতি নিতে হয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজা থেকে চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি ও মেডিকেল ইভাকুয়েশন কঠোরভাবে সীমিত করা হয়েছে। এতে হাজারো গুরুতর অসুস্থ ও আহত ফিলিস্তিনি গুরুতর রোগের চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। যুদ্ধবিরতি চুক্তির চার মাস পর রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে খুলে দেয়া হলেও প্রতিদিন প্রায় ৫০ জন রোগীকে বের হওয়ার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। তাও ইসরায়েলি অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল।

ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, গাজায় ২০ হাজারের বেশি মানুষ জরুরি চিকিৎসার জন্য বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৪ হাজার শিশু। ফেব্রুয়ারিতে রাফাহ পুনরায় খোলার পর ৩০ জুন পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ৬৫৫ জন রোগীকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে অনুমতির অপেক্ষায় থাকা অবস্থায় ১ হাজার ৫৭০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন।

‘প্রতিদিন আমার শারীরিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে’
চিকিৎসার দীর্ঘ অপেক্ষা খুলুদের শারীরিক অবস্থাকে আরও সংকটাপন্ন করে তুলেছে। তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, পেটে পানি জমে পেট ফুলে যাচ্ছে এবং অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে প্রায় ২০ কেজি ওজন হারিয়েছেন তিনি। পেটে পানি জমার কারণে দীর্ঘ সময় খাবারও খেতে পারেন না। খাবার খেলেই পেটে তরলের পরিমাণ বেড়ে যায়।

পাঁচ বছর বয়সী এক ছেলে ও নয় মাস বয়সী এক মেয়ের মা খুলুদ জানিয়েছেন, সন্তান জন্মের পর থেকেই ছোট মেয়েকে কোলে নেয়ার মতো অবস্থায় নেই তিনি। অসুস্থতার কারণে সন্তানদের প্রতি নিজের দায়িত্বও পালন করতে পারছেন না। তিনি এখন শয্যাশায়ী এবং বিছানা থেকে খুব কমই উঠতে পারেন। তিনি বলেন, ‘এখন আমি বেশিক্ষণ হাঁটতেও পারি না। অল্প দূরত্ব হাঁটলেই প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ি। আমি ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

বাস্তুচ্যুতির মধ্যেই ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই
গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পাশাপাশি বারবার বাস্তুচ্যুতিও ক্যানসার রোগীদের পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। পরিষ্কার পানি, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে সংকট আরও বেড়েছে।

যুদ্ধে নিজের বাড়ি ধ্বংস হওয়ার পর থেকে প্রায় ৩০ বার বাস্তুচ্যুত হয়েছেন খুলুদ। সর্বশেষ খান ইউনিসের পশ্চিমে মাওয়াসি আল-কারারায় একটি তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। সেখানে থাকার কিছুদিন পর তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। তাই তাঁবুতে থাকা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। পরে বড় বোনের কাছে আশ্রয় নেন। তার বোনও বাস্তুচ্যুত হয়ে আহমেদ বিন আবদুল আজিজ স্কুলের সিঁড়ির নিচে থাকেন। বর্তমানে দুই পরিবারের প্রায় ১০ জন সেখানে বসবাস করছেন।

তার বিছানার পাশে ওষুধের একটি বাক্স রাখা, যা ইঁদুর থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। এর পাশে একটি ব্যাগে রয়েছে প্রায় ৫০টি একাডেমিক সার্টিফিকেট, যা তিনি বছরের পর বছর পড়াশোনা এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জন করেছেন। ক্যানসার তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়ার আগে, পরিবারের লোকজন ও বন্ধুরা তাকে একজন ‘বইপোকা’ হিসেবে চিনতেন।

তিনি বলেন, ‘আমার মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর, গাজার ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে তাদের ইতিহাসে প্রথম শিক্ষার্থী হিসেবে সম্মানিত করে, যিনি দুই বছরের মাস্টার্স প্রোগ্রাম মাত্র এক বছর চার মাসে শেষ করেছেন।’

তিনি পিএইচডি শুরু করার পর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হন। তিনি বলেন, ‘আমি শিখতে ভালোবাসি। আমার পুরো জীবনটাই শিক্ষার জন্য উৎসর্গীকৃত। আমার স্বপ্ন ছিল একজন অধ্যাপক হওয়া এবং পিএইচডির পরেও আমার শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়া। আমি কখনও শেখা থামাতে চাইনি। ‘কিন্তু এই অসুস্থতা আমার কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়েছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *