কানাডায় ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক দাবানলের ধোঁয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা ঢেকে যাওয়ার পর দেশটির ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, কানাডার ‘ইচ্ছাকৃত অবহেলার’ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে ‘দূষিত ও অস্বাস্থ্যকর বাতাস’ প্রবেশ করছে। তবে কানাডার কর্মকর্তারা বলছেন, দাবানল মোকাবিলায় দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে সহযোগিতা করে আসছে।
শুক্রবার (১৭ জুলাই) কানাডিয়ান ওয়াইল্ডল্যান্ড ফায়ার ইনফরমেশন সিস্টেমের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় ৮৮৮টি দাবানল সক্রিয় ছিল। এর বেশিরভাগই তখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল।
দাবানলে এখন পর্যন্ত কানাডার প্রায় ৩০ লাখ হেক্টর বনভূমি পুড়ে গেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
এই দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা, মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, ওহাইও ও নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকায় ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বায়ুমানের সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং বাতিল করা হয়েছে অনেক বাইরের অনুষ্ঠান।
বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা আইকিউএয়ারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ বায়ুমানের শহরের তালিকায় ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ডেট্রয়েট। এরপর ছিল শিকাগো, ওয়াশিংটন ডিসি এবং নিউইয়র্ক।
কানাডার দাবানল নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতারাও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রিপাবলিকান দলের চার আইনপ্রণেতা: জন জেমস, জন মুলেনার, জ্যাক বার্গম্যান ও লিসা ম্যাকক্লেইন, কানাডার কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো এক খোলা চিঠিতে বলেছেন, এ বিষয়ে তাদের ‘ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে’।
তারা অভিযোগ করেন, বন ব্যবস্থাপনা, শুকনো জ্বালানি কমানো এবং নিয়ন্ত্রিত আগুন ব্যবহারের মতো বিষয়গুলোতে কানাডা যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সরল নয়। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. প্যাট্রিক জেমস বলেন, ‘আবহাওয়া কোনো আন্তর্জাতিক সীমান্ত মানে না। বাতাসের গতিপথ অনুযায়ী এক দেশের আগুনের ধোঁয়া অন্য দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, কানাডার বর্তমান দাবানলের অনেকগুলোই দেশটির বিশাল ও দুর্গম বনাঞ্চলে ছড়িয়েছে, যেখানে আগুন শুরু হওয়ার পর তা দ্রুত শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তারা আরও বলছেন, উন্নত বন ব্যবস্থাপনা কিছু এলাকায় ঝুঁকি কমাতে পারে, বিশেষ করে জনবসতির আশপাশে। তবে এত বিশাল বনাঞ্চলজুড়ে সব ধরনের দাবানল প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, জুনের শেষ দিকে, উত্তর অন্টারিওতে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ও স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের কারণে এবার দাবানলের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণেও দীর্ঘমেয়াদে আরও তীব্র ও ঘন ঘন দাবানলের ঝুঁকি বাড়ছে বলে তারা মনে করছেন।
ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে কথা বলে দেশটির ‘অবহেলা’ সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাইবেন তিনি। কানাডা বন ও ঝোপঝাড়ের যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করছে না বলেও অভিযোগ করেন ট্রাম্প।
এদিকে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ রিপাবলিকান নেতাদের কেউ কেউ আবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার পুরোনো মন্তব্য সামনে এনেছেন। এ নিয়ে কানাডায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
এর আগে, কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছিলেন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করা দুই দেশেরই যৌথ দায়িত্ব।
ট্রাম্পের মন্তব্যের পর কানাডার জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় দুই দেশ নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে। ১৯৮২ সালের পারস্পরিক অগ্নিনির্বাপণ চুক্তিসহ বিভিন্ন ব্যবস্থার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দীর্ঘদিন ধরে একে অপরকে সহায়তা করে আসছে।
কানাডা জানিয়েছে, দাবানল প্রতিরোধ ও বন সংরক্ষণে তারা প্রায় ১২ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার বিনিয়োগ করেছে।
এদিকে, বাণিজ্য ইস্যুতে গত এক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা সম্পর্কেও টানাপোড়েন চলছে। কয়েক দশকের মুক্ত বাণিজ্যের পরও গত বছর কানাডার ওপর শুল্ক আরোপ করেছিলেন ট্রাম্প, তবে এখনো দুই দেশের মধ্যে নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তি হয়নি।












