তাহিরপুরে শিশুদের ক্রিকেট খেলার সময় অটোরিকশায় বল পড়াকে কেন্দ্র করে চার গ্রামের বাসিন্দাদের সঙ্গে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের লোকজনের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২৫ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ চলাকালে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের চারটি দোকানে ভাঙচুর ও লুটপাট এবং একটি ঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
বুধবার দুপুরে তাহিরপুর সহকারী পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আহতদের তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কয়েক দিন আগে বীরজয়-লক্ষ্মী-ধুতমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে ক্রিকেট খেলার সময় একটি বল মধ্য তাহিরপুর গ্রামের জালাল মিয়ার অটোরিকশায় গিয়ে পড়ে। এ নিয়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের হাফিজ মিয়ার সঙ্গে ক্রিকেট খেলোয়াড়দের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
এর জের ধরে ওই দিন বিকেলে তাহিরপুর বাজারে ধুতমা গ্রামের জসিম উদ্দিনকে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের কয়েকজন মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে হাফিজ মিয়াকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তার পক্ষের লোকজন। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার রাতে বীরনগর গ্রামের একটি মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর বুধবার সকালে বীরনগর, জয়নগর, লক্ষ্মীপুর ও ধুতমা গ্রামের লোকজন একত্রিত হয়ে মধ্য তাহিরপুর গ্রামের দিকে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
এতে বীরনগর গ্রামের ওয়াজ আলীর ছেলে মাইনুদ্দিন (৩৫), সুবাহানের ছেলে আশিষ মিয়া (৪০), আলীমের ছেলে রেজাউল (৩৫) ও নবী হোসেনের ছেলে খোকন মিয়া (৩৬) গুরুতর আহত হন। তাদের সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
মধ্য তাহিরপুর গ্রামের দোকানদার দুলু মিয়া বলেন, চার গ্রামের লোকজন এসে আমাদের দোকানপাটে হামলা চালায়। দোকানের মালামাল লুট করে নিয়ে যায় এবং ভাঙচুর করা হয়। পরে একটি ঘরে আগুন দেওয়া হয়েছে। আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা চাই।
একই গ্রামের বাসিন্দা তানিম আহমদ লিংকন বলেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চার গ্রামের লোকজন একত্রিত হয়ে হামলার ঘোষণা দেয়। এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাদের বাধা দিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলেও তারা তা মানেননি। পরে মাইকে ঘোষণা দিয়ে আমাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়। নারী-শিশুরাও হামলার শিকার হয়েছেন। গরু-ছাগল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
মধ্য তাহিরপুর গ্রামের খাদিজা বেগম বলেন, দেশি অস্ত্র ও দলবল নিয়ে লোকজন আমাদের বাড়ির দিকে আসার সময় ইউএনও, ওসি ও স্থানীয় নেতারা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা কারও কথা না শুনে হামলা চালায়। পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, একটি ছোট ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মসজিদের মাইক ব্যবহার করে লোকজন জড়ো করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করা এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
অভিযোগের ব্যাপারে বীরনগর গ্রামের বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি সদস্য বাবুল মিয়া বলেন, শিশুদের ক্রিকেট খেলার সময় ইজিবাইকে বল পড়া নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। এরপর দুপক্ষের মধ্যে মারধর ও পাল্টা মারধরের ঘটনা ঘটে। দুপক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছিল; এলাকার লোকজন ও প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে।
জয়নগর গ্রামের বাসিন্দা, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও তাহিরপুর সদর ইউপি চেয়ারম্যান জুনাব আলী বলেন, ‘তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে মারামারি থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আমি বর্তমানে ঢাকায় আছি, আজকের ঘটনায় আমরা লজ্জিত। সংসদ সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের বাড়ি এই এলাকায় হলেও আমরা পরিস্থিতি সামাল দিতে পারিনি। উভয়পক্ষের অতিউৎসাহী কিছু লোকের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে। তবে এলাকার মানুষ, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ এটি রোখার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে।’
তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ বলেন, মসজিদে মাইকিংয়ের পর থেকেই এলাকায় পুলিশ মোতায়েন ছিল। ঘটনার সময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করেছে। বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে এলাকায় পুলিশি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত মামলা দায়ের বা কাউকে আটক করা হয়নি।



