গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগ বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের উপর ছাত্রদলের হামলার ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় দৈনিক আমার সংবাদ ও গণকণ্ঠ পত্রিকার গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি তৌহিদুর রহমান তুহিন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট ) দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের সামনে এই হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল ও এনসিপির নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি ইউএনও কার্যালয় চত্বর প্রদক্ষিণ করার সময় উত্তেজিত নেতাকর্মীরা কার্যালয়ের দ্বিতীয় তলার জানালা, চেয়ার ও ফুলের টব ভাঙচুর করে। এ সময় পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভিডিও ধারণ করছিলেন সাংবাদিক তৌহিদুর রহমান তুহিন। হঠাৎ করেই যুবদলের ফারুখ নামে এক নেতা উত্তেজিত হয় এবং ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মী তার ওপর হামলা চালায়। স্থানীয় বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইকবাল, উদাখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাইদসহ কয়েকজন নেতাকর্মী তাকে প্রাণে বাঁচান।
হামলার শিকার সাংবাদিক তৌহিদুর রহমান তুহিনের হার্টে দুটি রিং বসানো। সাম্প্রতিক সময়ে হার্ট অ্যাটাকের পর দুটি রিং স্থাপন করার পর থেকেই তিনি নিয়মিত চিকিৎসা ও ঔষধের ওপর নির্ভরশীল। ডাক্তার তাকে ১৪ দিনের বেড রেস্ট দিয়েছিলেন এবং পুনরায় এনজিওগ্রাম করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। শারীরিক অসুস্থতা উপেক্ষা করেই তিনি সংবাদ সংগ্রহের জন্য ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ঘটনার পর তাকে গাইবান্ধা আধুনিক সদর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
ঘটনার পর সাংবাদিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাংবাদিকরা বলছেন, যিনি নিজের শারীরিক কষ্টকে উপেক্ষা করে সত্য প্রকাশের জন্য সংবাদ সংগ্রহ করছেন, তাকেই যদি হামলার শিকার হতে হয়, তাহলে তা সাংবাদিকতার স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
জানা যায়, গত ৫ আগস্ট হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হওয়ার পর তার বুকে দুটি রিং বসানো হয়। এরপর নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের ওপর চলছিলেন তিনি। সম্প্রতি দখলীয় জমি নিয়ে ঝামেলায় পড়ে আবারও অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৬ জুলাই ঢাকা ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে চিকিৎসা নিয়ে ডাক্তার তাকে ১৪ দিনের বেড রেস্ট দেন এবং পুনরায় এনজিওগ্রাম করার পরামর্শ দেন। ১২ দিন তিনি বিছানা থেকে উঠতে পারেননি। হাঁটলেই বুকে চাপ ধরতো। এরপর গতকাল শারীরিকভাবে একটু সুস্থতা পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান সংবাদ সংগ্রহ করতে।
হামলার শিকার সাংবাদিক তৌহিদুর রহমান তুহিন বলেন, ফ্যামিলি কার্ড শুমারির সুপারভাইজার ও তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। তার প্রতিবাদে ডাকা কর্মসূচির সংবাদ কাভারেজ করা যদি অপরাধ হয়ে থাকে, তাহলে তিনি অপরাধী। কিন্তু এই অপরাধের জন্য সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা যদি সাংবাদিকের ওপর হামলা করে, সেখানে আর কিছুই করার থাকে না। তিনি জানান, টাকা ম্যানেজ হলে চিকিৎসার জন্য আবার ঢাকায় যাবেন এবং সবাইকে তার সুস্থতার জন্য দোয়া চেয়েছেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সুপারিশে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনিয়ম ও কারসাজিপূর্ণ। তারা তালিকা বাতিল ও পুনরায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগের দাবি জানান। ফুলছড়ি উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জয়নাল আবেদীন বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচিতে যারা নিয়োগ পেয়েছে তাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের লোক। ছাত্রদলসহ সাধারণ মানুষের দাবি এই ফরমায়েশি নিয়োগ বাতিল ও পুনরায় নিয়োগ প্রক্রিয়া দেওয়া হোক। এনসিপির জেলা যুগ্ম সমন্বয়ক মাকসুদুর রহমান আরিফ বলেন, কারসাজির মাধ্যমে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এই সুপারিশকৃত নিয়োগের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের শাস্তি চাই তারা।
ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের সুপারভাইজার পদে এক হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছিল। সরকারি নিয়ম অনুসরণ করে সেখান থেকে মেধার ভিত্তিতে ৭৩ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যারা নিয়োগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, তারাই ক্ষুব্ধ হয়ে ভাঙচুর করেছেন।
ফুলছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুরুল হোদা বলেন, গতকাল পরিবেশ উত্তপ্ত ছিল। বর্তমানে পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা যাতে না ঘটে সেজন্য পুলিশ সবসময় সজাগ রয়েছে।
সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত কোনো মামলা দায়ের বা অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। তবে স্থানীয় সাংবাদিকরা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সাংবাদিকের ওপর হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত।
দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা পেশায় জড়িত তৌহিদুর রহমান তুহিন ২০২০ সালে এশিয়ান টেলিভিশনের ফুলছড়ি ও সাদুল্লাপুর উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে যাত্রা শুরু করেন। পরবর্তীতে বেশ কিছু মিডিয়ায় গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান তিনি। তার মতো সংগ্রামী সাংবাদিকের ওপর হামলা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর হামলা নয়, এটি সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সত্য প্রকাশের অধিকারের ওপরও আঘাত। স্বাধীন পেশার ওপর আঘাত মানেই জাতির জীবনে কালো অধ্যায় রচিত হয়।
উল্লেখ্য, গাইবান্ধা জেলার অন্যান্য উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ডের নিয়োগ অনিয়মের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও ইউএনও কার্যালয় ঘেরাও করা হলেও কোথাও ভাঙচুর বা সাংবাদিকের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেনি। শুধু ফুলছড়ি উপজেলাতেই এই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলো।




