কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বেসরকারি জমজম হাসপাতালের বিরুদ্ধে অপচিকিৎসা ও অতিরিক্ত বিল আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা হাসপাতালটির কার্যক্রম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
মাতামুহুরী উপজেলার বিএমচর ইউনিয়নের বাসিন্দা ইব্রাহিম অভিযোগ করে বলেন, তাঁর আড়াই বছর বয়সী কন্যা শারমিন জ্বরে আক্রান্ত হলে গত বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে তাকে জমজম হাসপাতালে নেওয়া হয়। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসার পরামর্শ দেন। পরে তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। প্রায় ৬০ ঘণ্টা চিকিৎসার পর রোববার সকালে ছাড়পত্র নিতে গেলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ৮ হাজার ৫০ টাকার বিল ধরিয়ে দেয়।
ইব্রাহিম বলেন, তিনি একজন সিএনজিচালক। বিল কমানোর অনুরোধ জানিয়ে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। পরে মাত্র ৫০০ টাকা কমানোর আশ্বাস দিয়ে দ্রুত বিল পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীরা জানান, আড়াই দিন হাসপাতালে অবস্থান করলেও তিন দিনের বিল আদায় করা হয়েছে। বিলের হিসাবে ভর্তি ফি ৪০০ টাকা, সিট ভাড়া ২ হাজার ১০০ টাকা, সার্ভিস চার্জ ২ হাজার ১০০ টাকা, চিকিৎসকের রাউন্ড ফি (তিনবার) ২ হাজার ১০০ টাকা, ক্যানোলা ফি ৩০০ টাকা, নেবুলাইজার চার্জ ৬০০ টাকা এবং রাইস টিউব বাবদ ৪৫০ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশুটির অভিভাবক আরও দাবি করেন, শিশুটিকে ভুল মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে। পরে অন্য একটি হাসপাতালে প্রেসক্রিপশন দেখালে সেখানকার চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি ওষুধ প্রয়োগ করা হয়েছে। এতে শিশুটির স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, মাতারবাড়ীর এক নবজাতকের নানা অভিযোগ করেন, প্রসবজনিত কারণে তাঁর মেয়েকে গত ১৩ জুলাই জমজম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিন দিনের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালটি ৪৫ হাজার টাকা বিল আদায় করে। পরে ১৫ দিন বয়সী নবজাতক জন্ডিসে আক্রান্ত হলে তাকে আবারও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দুই দিন চিকিৎসার পর ছাড়পত্রের সময় ৮ হাজার ১২০ টাকা বিল নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হাসপাতালটিতে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে এবং চিকিৎসাসেবার মান নিয়েও নানা প্রশ্ন রয়েছে। তাঁরা বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এ সময় উপস্থিত আলমগীর হোসেন রানা বলেন, সেবার নামে রোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে, যা দিনের আলোয় ডাকাতির শামিল। এ ধরনের বাণিজ্য বন্ধ হওয়া উচিত।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও হাসপাতালটির বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ আল নোমান নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, এই জমজম হাসপাতাল ডাকাতের স্বর্গরাজ্য। প্রশাসনের প্রশ্রয়ে তারা এসব অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে জমজম হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) গোলাম কবির বলেন, কেউ খারাপ ব্যবহার করেছে কি না বা ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে কি না, তা রোগী ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে যাচাই করা যেতে পারে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জায়নুল আবেদীন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি পরে যোগাযোগ করতে বলেন।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ছাবের বলেন, জমজম হাসপাতালের কার্যক্রম এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি পুনরায় কার্যক্রম শুরু করে। হাসপাতালটির লাইসেন্স গত দুই বছর ধরে নবায়ন করা হয়নি। অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগটি অত্যন্ত দুঃখজনক। এ বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *