চিকিৎসক নেই আড়াই বছর ধরে, কমছে রোগীর সংখ্যা, বন্ধ প্রসূতিতের অস্ত্রপাচার

চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গাইনি চিকিৎসক নেই আড়াই বছর ধরে। এতে বন্ধ রয়েছে প্রসূতিতের অস্ত্রোপচার। অলস পড়ে রয়েছে অপারেশন থিয়েটার। বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে গর্ভবতী মায়েদের।

১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মতলব উত্তর উপজেলা। এখানকার পাঁচ লক্ষাধিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিতে ২০০৮ সালে ছেংগারচর পৌরসভার বড় মরাধন এলাকায় নির্মাণ করা হয় ৩১ শয্যার মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। চর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে এটি নির্মিত হওয়ায় চিকিৎসকেরা এখানে নিয়োগ পেলেও দ্রুতই অন্যত্র চলে যান। ফলে হাসপাতাল নির্মাণের ১৩ বছর অতিবাহিত হলেও অপারেশন থিয়েটারটি এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেই জুনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনি, জুনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জারি, জুনিয়র কনসালট্যান্ট মেডিসিন। তিন মাস আগে জুনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যানেসথেসিয়া নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু জুনিয়র কনসালট্যান্ট সার্জন ও জুনিয়র কনসালট্যান্ট গাইনি চিকিৎসক না থাকায় অ্যানেসথেসিওলজিস্ট কোনো সেবা দিতে পারছেন না।

এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা নিয়োগে থাকলেও তিনি ডেপুটেশনে কাজ করছেন অন্যত্র। এখানকার সাব সেন্টারে ছয়জন চিকিৎসক থাকার কথা। কিন্তু আছে দুজন। তবে এর মধ্যে একজন আবার ডেপুটেশন নিয়ে চলে গেছেন অন্যত্র।

সব মিলিয়ে মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সেবার মান থুবড়ে পড়েছে বিভিন্ন কারণে। ফলে গত বছরের তুলনায় এ বছর সেবা গ্রহণকারী রোগীর সংখ্যাও কমেছে। দায়িত্বে অবহেলা আর অনেক পদ শূন্য থাকায় ৩১ শয্যাবিশিষ্ট এই হাসপাতাল এখন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে।

রবিবার (২৭ অক্টোবর) সরেজমিন দেখা গেছে, আগের মতো রোগীর তেমন ভিড় নেই। জরুরি বিভাগেও কোনো কোলাহল নেই।

জানতে চাইলে কয়েকজন সেবাগ্রহীতা জানান, এই হাসপাতালে এখন আর আগের মতো সেবা পাওয়া যায় না। চিকিৎসকরা যেসব ওষুধ লেখেন, এর মধ্যে ৯০ শতাংশ ওষুধের সাপ্লাই নেই। ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূর থেকে চিকিৎসা নিতে গিয়ে উল্টো বিপদে পড়তে হয় রোগীদের। তা ছাড়া জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ থাকায় সব প্রসূতিকে প্রাইভেট হাসপাতালে নিতে হয়। এতে আর্থিক বিপদে পড়েন নিম্নমধ্যবিত্তরা। এ ছাড়া হাসপাতালে রয়েছে পর্যাপ্ত চিকিৎসকের অভাব। তাই এই হাসপাতালে আর আগের মতো রোগী আসেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শীতের প্রাদুর্ভাব বাড়ায় মানুষের জ্বরসহ ঠান্ডাজনতি রোগের প্রকোপ বেড়েছে। নিয়মিত এমন রোগী এলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই। তা ছাড়া রোগী ভর্তি থাকলে যে খাবার দেওয়া হয়, তাও মানহীন। এসব বিষয়ে কর্তৃপক্ষ একেবারেই উদাসীন বলে অভিযোগ করেন রোগী ও স্বজনরা।

উপজেলার মিঠুর কান্দি থেকে চিকিৎসা নিতে আসা হামিদুর রহমান বলেন, ‘আমার বোনের সন্তান হবে। ব্যথা উঠলে আমরা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে আসি। এসে জানতে পারি এখানে অপারেশনের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাঁরা আমাদের অন্য হাসপাতালে যেতে বলেন। পরে ছেংগারচরে একটা বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে অপারেশন করাই।’

এ বিষয়ে এখানে সেবা নিতে আসা বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী জানান, প্রসূতি মায়েরা এই উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সবিমুখ। কেননা, এখানে ডাক্তার নেই। তাই অপারেশন হয় না। অথচ দরিদ্র মায়েদের জন্যই এই সরকারি হাসপাতাল। আরও জানা গেছে, গাইনি চিকিৎসক না থাকায় আড়াই বছর ধরে ধরে বন্ধ রয়েছে জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন। ফলে অন্তঃসত্ত্বারাও আগের মতো সেবা নিতে আসেন না এখানে।

এখানে গাইনি ডাক্তার না থাকায় মতলব উত্তর এলাকায় দরিদ্র মায়েরা টাকার অভাবে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ও ঘটিয়েছে, ছেংগারচর প্রাইভেট হাসপাতালে সিজার করিয়ে সন্তান বিক্রি করে হাসপাতালের বিল মেটাতে হয়েছে। এ নিয়ে তোলপাড় হয়, তখন দৈনিক পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

স্থানীয়দের দাবি, কয়েকমাস যাবত হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগ কার্যত বন্ধ। নষ্ট হয়ে পড়ে আছে আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন। কয়েক বছর ধরে বন্ধ এক্স-রে সেবাও, নেই সিজারিয়ান অপারেশনও। ফলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে রোগীদের যেতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলার প্রায় ৫ লাখ মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান ভরসাস্থল এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। অথচ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা সচল না থাকায় দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন। সরকারি হাসপাতালে কম খরচে সেবা পাওয়ার সুযোগ না থাকায় বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হচ্ছে তাদের।

হাসপাতালে গাইনি চিকিৎসক থাকলেও তিনি বর্তমানে ডেপুটেশনে ঢাকার পিজি হাসপাতালে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে নারী ও প্রসূতি রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাশাপাশি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকট রয়েছে, এছাড়া চিকিৎসকরা সময় মতো হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন না বলেও অভিযোগ করেছেন রোগী ও স্বজনরা।

স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, সরকারি দায়িত্ব পালনের নির্ধারিত সময় থাকা সত্ত্বেও চিকিৎসকদের কেউ কেউ যদি সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত থাকেন না, কিংবা দায়িত্বের সময় শেষ হওয়ার আগেই হাসপাতাল ত্যাগ করেন, চিকিৎসকদের উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বিষয়টি নিয়মিত মনিটরিং এবং অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের সমস্যার কারণে হাসপাতালটির ওপর মানুষের আস্থা কমছে। চিকিৎসক, যন্ত্রপাতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধ সবগুলো সেবা নিশ্চিত করা না গেলে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

মতলব উত্তর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রাজন চন্দ্র দাস বলেন, গাইনি চিকিৎসক না থাকায় জরুরি সিজারিয়ান অপারেশন বন্ধ রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা একাধিকবার কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি লিখেছি।আর আমাদের চিকিৎসাসেবা ভালোই চলছে। তবে একাধিক পদ শূন্য থাকায় আগের মতো সেবা দিতে পারছি না। তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কোনো চিকিৎসক যদি সময়মতো হাসপাতালে উপস্থিত না থাকেন কিংবা দায়িত্ব পালনে অবহেলা করেন, তবে বিষয়টি তদন্ত ও যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া হাসপাতালের যেসব চিকিৎসাসেবা ও ওষুধের সমস্যা রয়েছে, সেগুলো দ্রুত সমাধানের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে অবহিত করেছি। সেই সাথে জনবল সংকটের কারণে স্বাস্থ্য সেবার স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। তবে জনবল সংকটের মধ্যদিয়েও আমরা আমাদের সামর্থ্যের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করছি। এসব কথা অকপটে স্বীকার করেন।

তিনি আরও বলেন চিকিৎসক সংকটের সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কোন সুফল পাওয়া যায়নি।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top