বিশ্বখ্যাত আর্থিক পরামর্শমূলক গ্রন্থ ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’-এর লেখক রবার্ট কিওসাকি (৭৯) নিজের বিস্তৃত রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় ১২০ কোটি মার্কিন ডলারের (১.২ বিলিয়ন ডলার) বিশাল ঋণের জালে রয়েছেন। তবে এই বিপুল পরিমাণ দেনাকে কোনো ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন না তিনি; বরং ধনী ব্যক্তিদের মতো আয়বর্ধক সম্পদ গড়ে তুলতে ঋণকে একটি কার্যকর কৌশল হিসেবে ব্যবহারের দাবি করে নিজের এই ঋণের কথা বারবার প্রচার করছেন তিনি।
সম্প্রতি ‘গেট রিচ এডুকেশন’ শীর্ষক এক পডকাস্টে কিওসাকি নিজেই তার দেনার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমি প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণে আছি।’ তবে প্রয়োজনীয় আর্থিক শিক্ষা ছাড়া সাধারণ মানুষকে অন্ধভাবে তার এই পথ অনুসরণ না করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৭৪ সাল থেকে আমি এটি নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা করেছি। সুতরাং ঋণকে যদি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান, তবে আগে সে বিষয়ে সঠিক শিক্ষা নেওয়া জরুরি।’
এদিকে সাময়িকী ‘ভ্যানিটি ফেয়ার’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কিওসাকির সাবেক স্ত্রী ও ব্যবসায়িক অংশীদার কিম কিওসাকি জানান, এই ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক ভুল বোঝাবুঝি রয়েছে। এই বিপুল ঋণ কিওসাকির একক বা ব্যক্তিগত কোনো দায় নয়; বরং অংশীদারদের সঙ্গে তাদের যৌথ মালিকানাধীন প্রায় ১ হাজার ৫০০টি অ্যাপার্টমেন্ট ও আবাসন প্রকল্পের বিপরীতে এই ঋণ রয়েছে। কিম জানান, চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে মানুষের নজর কাড়তে কিওসাকি প্রায়ই এই বড় অঙ্কের কথাটি উল্লেখ করেন এবং পরবর্তীতে কেন বিনিয়োগভিত্তিক ঋণ ভালো—তা ব্যাখ্যা করেন।
ভ্যানিটি ফেয়ারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিওসাকির এই ঋণ মূলত তার বিশেষ বিনিয়োগ কৌশলেরই একটি অংশ। তার কেনা রিয়েল এস্টেট সম্পত্তির মূল্য বৃদ্ধি পেলে তিনি সেই বর্ধিত ইক্যুইটির বিপরীতে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেন এবং সেই অর্থ করমুক্ত আয় হিসেবে পরবর্তী বিনিয়োগে ব্যবহার করেন। এছাড়া সম্ভাব্য আর্থিক বিপর্যয় থেকে বাঁচতে তিনি প্রতিটি বিনিয়োগ আলাদা আলাদা লিমিটেড লায়াবিলিটি কোম্পানির (এলএলসি) অধীনে রাখেন, যাতে একটি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্যগুলো সুরক্ষিত থাকে। কিওসাকির ভাষায়, ‘পরিস্থিতি খারাপ হলে আমার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলা যাবে। ধনীরা মূলত ফায়ারওয়াল বা সুরক্ষাব্যবস্থা তৈরি করে এভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করে।’ সাময়িকীটির হিসাব অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৩০ লাখ ডলার আয় করা কিওসাকির ব্যক্তিগত অংশের ঋণের পরিমাণ আনুমানিক ৩ কোটি থেকে ৬ কোটি ডলারের মধ্যে হতে পারে।
আবাসন ও আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা কিওসাকির এই কৌশল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ট্যাক্স পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ট্যাক্স ম্যাভেরিক এআই’-এর প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড এ. পেরেজ এই কৌশলকে সমর্থন করে বলেন, রিয়েল এস্টেট সম্পদে বড় অঙ্কের ঋণ থাকা খুবই স্বাভাবিক এবং কর সাশ্রয়ের জন্য এটি একটি চমৎকার উপায়। তবে এর ফলে বন্ধকের কিস্তি ও সুদের বোঝা বাড়ে এবং নগদ প্রবাহ কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
অন্যদিকে সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘জেপিটিডি পার্টনার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা জন পুল। তিনি বলেন, ঋণ যেমন ভালো হতে পারে, তেমনি তা বিপদের কারণও হতে পারে। তবে ১.২ বিলিয়ন ডলারের ঋণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অত্যন্ত দক্ষ ও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। তিনি মন্তব্য করেন, ‘সম্পদের মূল্য যখন বাড়তে থাকে, তখন ঋণ চমৎকার ফল দেয়। কিন্তু বাজার বিপরীত দিকে ঘুরলে এটি মারাত্মক আর্থিক বিপর্যয় ডেকে আনে। কিওসাকি হয়তো একে ধনীদের ঋণ বলতে পারেন, তবে সাধারণ কোনো বিনিয়োগকারী সতর্ক না থাকলে খুব দ্রুত দেউলিয়া হয়ে যেতে পারেন।’
উল্লেখ্য, রবার্ট কিওসাকি ১৯৯৭ সালে প্রথম স্ব-উদ্যোগে ‘রিচ ড্যাড পুওর ড্যাড’ বইটি প্রকাশ করেন, যা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং চার কোটি ৪০ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়। বইটিতে তিনি তার জন্মদাতা পিতা ও শিক্ষাবিদ রালফ কিওসাকির (পুওর ড্যাড) প্রচলিত মানসিকতার সঙ্গে তার বন্ধুর বাবা ও প্রতিষ্ঠিত হোটেল ব্যবসায়ী রিচার্ড কিমির (রিচ ড্যাড) বাস্তবমুখী ধনী হওয়ার কৌশলের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। আর্থিক শিক্ষার ওপর ভিত্তি করে একটি সফল করপোরেট সাম্রাজ্য গড়ে তোলা কিওসাকি ২০০৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যৌথভাবে ‘হোয়াই উই ওয়ান্ট ইউ টু বি রিচ’সহ দুটি বই রচনা করেন।


