মাহবুবুজ্জামান সেতু, নওগাঁ প্রতিনিধিঃ নওগাঁর মান্দায় মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি), দাখিল ও এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষার ২০২৬ সালের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। প্রকাশিত ফলাফলে উপজেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যাপক সাফল্য ও চরম বিপর্যয়ের এক মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ ও সর্বোচ্চ পাসের হার নিয়ে মেধার স্বাক্ষর রাখলেও, বিপরীত চিত্রে ৫টি মাদ্রাসা ও ২টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, এবার উপজেলার মোট ১১৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরীক্ষায় অংশ নেয়।
সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবার ৬৭টি স্কুলের মোট ৩,১০২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২,৮২১ জন পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে সর্বমোট ১,৭৬০ জন শিক্ষার্থী কৃতকার্য হয়েছে এবং মোট জিপিএ-৫ এসেছে ১৫৮টি। গড় পাসের হার ৬২.৩৮ শতাংশ।
জিপিএ-৫ (এ+) প্রাপ্তির দিক থেকে উপজেলায় এবার একক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে কালীগ্রাম দোডাঙ্গী উচ্চ বিদ্যালয়। এই প্রতিষ্ঠানটি থেকে সর্বোচ্চ ২৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। সাফল্যের তালিকায় এর পরেই রয়েছে মান্দা থানা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, যেখান থেকে ১২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। এছাড়া চকগোপাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১১ জন এবং গোয়ালমান্দা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
পাসের হারের দিক থেকে সাধারণ স্কুলগুলোর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৯৯.৩৩%, বিষ্ণপুর চকশৈল্যা উচ্চ বিদ্যালয় ৯০.৪৮%, কালীগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় ৮৭.৫০%,বুড়িদহ উচ্চ বিদ্যালয় ৮৪.৭৮%,ছোটমুল্লুক বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়৮৩.৩৩%,মুশিদপুর উচ্চ বিদ্যালয় ৮২.৬১%,চকগোপাল উচ্চ বিদ্যালয় ৮০.২০%,চকউলী বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় ৭৯.৪৯%,ফতেপুর (২য়) উচ্চ বিদ্যালয় ৭৭.৫%,আইওরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয় ৭৫.৭৬%,মটগাড়ী উচ্চ বিদ্যালয় ৭৫.৪৭%,পি.কে উচ্চ বিদ্যালয়৭৩.৬৮%, এখরুখী উচ্চ বিদ্যালয় ৭৩.৩৩%,মান্দা শ্যামচাঁদ মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ৭১.৪৩%, তেঁতুলিয়া ধনীবিবি উচ্চ বিদ্যালয় ৭০.০০%,গোয়ালমান্দা উচ্চ বিদ্যালয় ৬৯.৭০%,দক্ষিণ মৈনম উচ্চ বিদ্যালয় ৬৯.৩৭%,জি.এস বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়৬৮.৫০%,কালিকাপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ এবং কর্ণভাগ উচ্চ বিদ্যালয়৬৮.০০%,পাকুড়িয়া ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয় ৬৭.৩৫%,মান্দা থানা আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ৬৬.২২%,চকগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়৬৫.৫২%, নূরুল্যাবাদ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয়৬৫.১৫%,নবগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় ৬৪.২৯%,কাঁশোপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়৬২.২৬%,সাহাপুর ঢোলপুকুড়িয়া এলাকা উচ্চ বিদ্যালয় ৬১.৬৪%, বিদ্যামাধুরী শিক্ষায়তন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৬১.১১%,গোপালপুর চকগৌরি উচ্চ বিদ্যালয়৬০.০০%, মহানগর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়৫৮.৮২%,এনায়েতপুর আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় ৫৮.৭৮%,গোটগাড়ী শহীদ মামুন উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ ৫৮.৭৫%,পরানপুর উচ্চ বিদ্যালয় ৫৮.৪৩%,গোটগাড়ি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ৫৮.৩৩%,ভালাইন শুকরুল্যা ফকির উচ্চ বিদ্যালয় ৫৭.৬৯%,বাথইল গোপাল প্রামানিক উচ্চ বিদ্যালয়৫৭.১৪%,দাসপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়৫৬.৬৭%, মৈনম বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ ৫৫.৫৬%,গোবিন্দপুর উচ্চ বিদ্যালয় ৫১.৬৭%,সতীহাট কে.টি উচ্চ বিদ্যালয় ৫১.৬৫%শিশইল উচ্চ বিদ্যালয় ৫১.২২%,রামনগর উচ্চ বিদ্যালয় ৫১.১৬%,কয়াপাড়া কামাড়কুড়ি উচ্চ বিদ্যালয় ৫১.০২%,লক্ষীরামপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও আলালপুর হাজী শেখ আলম উচ্চ বিদ্যালয় ৫০%, পাস করিয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের অধীনে দাখিল পরীক্ষায় উপজেলার ৩৮টি মাদ্রাসার মোট ৭৩৮ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অংশ নেয়। তবে ফলাফল ও জিপিএ-৫ প্রাপ্তির চিত্র ছিল বেশ হতাশাজনক। পুরো উপজেলায় দাখিলে মাত্র ৩০৬ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে এবং জিপিএ-৫ (এ+) এসেছে মাত্র ৫টি। গড় পাসের হার ৪১.৪৬ শতাংশ। প্রাপ্ত ৫টি জিপিএ-৫-এর মধ্যে ৪টিই এসেছে পরানপুর কামিল মাদ্রাসা থেকে এবং ১টি এসেছে কালিকাপুর আলিম মাদ্রাসা থেকে। পাসের হারে এগিয়ে রয়েছে কালিকাপুর আলিম মাদ্রাসা ৮৫.১৯ %,মজিদপুর ফাজিল মাদ্রাসা ৮৪.২১%,চকবাবন দাখিল মাদ্রাসা ৮০.০০%,বানিসর দাখিল মাদ্রাসা ৭৬.০০%,গাইগানা দাখিল মাদ্রাসা এবং কুড়িয়াপাড়া দাখিল মাদ্রাসা ৭২.২২%,ভারশোঁ দাখিল মাদ্রাসা ৬৯.২৩%, পরানপুর কামিল মাদ্রাসা৬৮.১৮%,রেবা আকতার আলিম মাদ্রাসা৬৫.৭৭%,পিড়াকৈড় দাখিল মাদ্রাসা৬১.৯০%।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় ১১টি প্রতিষ্ঠানের মোট ২০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৯৭ জন অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে মাত্র ৮০ জন এবং জিপিএ-৫ এসেছে ৪টি। গড় পাসের হার ৪০.৬০ শতাংশ। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ৪ জনের মধ্যে ২ জন চকহরিনারায়ণ দাখিল মাদ্রাসা, ১ জন চকউলী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় এবং ১ জন বিষ্ণুপুর চকশৈল্যা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ণ হয়েছে।
সাফল্যের আনন্দের মাঝে উপজেলার ৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেমে এসেছে চরম ফল বিপর্যয়। ৫টি দাখিল মাদ্রাসা ও ২টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই এবার পাস করতে পারেনি।
শতভাগ ফেল করা মাদ্রাসাগুলো হলো,কুসুম্বা শাহী দাখিল মাদ্রাসা (৯ জন), রামনগর দাখিল মাদ্রাসা (১৩ জন), চকদেবীরাম আলিম মাদ্রাসা (১৫ জন), চকরঘুনাথ দাখিল মাদ্রাসা (১৩ জন) এবং এলেঙ্গা ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা (৬ জন)। অন্যদিকে কারিগরি শাখার অধীনে ঘোনা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজ (২ জন) এবং জোতবাজার আদর্শ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় (৫ জন) থেকে অংশ নেওয়া সব পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় এই দুই প্রতিষ্ঠানের পাসের হারও শূন্য (০) শতাংশে নেমে এসেছে। সব মিলিয়ে এই সাতটি প্রতিষ্ঠানের মোট ৬৩ জন পরীক্ষার্থীর সবাই ফেল করেছেন। অপরদিকে,সাতবাড়িয়া টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের কারিগরি শাখার কোন শিক্ষার্থী না থাকায় কেউ পরীক্ষায় অংশ গ্রহণই করে নাই।
বিশেষ করে চকদেবীরাম আলিম মাদ্রাসায় ২৮ জন শিক্ষক-কর্মচারীর বিপরীতে ১৫ জন পরীক্ষার্থীর একজনও পাস না করায় স্থানীয় অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এই ফল বিপর্যয়ের পেছনে কেন্দ্রের সিসিটিভি ক্যামেরাকে দায়ী করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. জালাল উদ্দিন দাবি করেন, হঠাৎ পরীক্ষার কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে শিক্ষার্থীরা ভীত ও বিহ্বল হয়ে পড়ায় পরীক্ষা খারাপ করেছে।
সংশ্লিষ্টসূত্রে জানা গেছে,জাতীয় শিক্ষানীতি, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের পরিচালনা ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী যেকোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট পাসের হার বজায় রাখা আইনি শর্ত। কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে পর পর তিন বছর বা নির্দিষ্ট সময়ের বেশি কাঙ্ক্ষিত পাসের হার না থাকলে অথবা শতভাগ পরীক্ষার্থী ফেল করলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এমপিও নীতিমালা ও সরকারি অনুদান প্রদান বিধিমালা অনুযায়ী উক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বা সরকারি আর্থিক অনুদান স্থগিত, কর্তন বা বাতিল করার স্পষ্ট আইনি সুযোগ রয়েছে।
তাছাড়া, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রবিধানমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধারাবাহিক খারাপ ফলাফল প্রদর্শন করলে বা নির্ধারিত শিক্ষাগত মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে শিক্ষা বোর্ড থেকে উক্ত প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি ও পরীক্ষার কেন্দ্র তালিকাভুক্তির অনুমোদন বাতিল বা স্থগিত করার আইনগত এখতিয়ার বোর্ডের রয়েছে।
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী জানান, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতভাগ ফেল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অতি দ্রুত এই শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের নিয়ে পর্যালোচনামূলক বৈঠক করা হবে। যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের দায়িত্বে গাফিলতি বা ধারাবাহিক ফল বিপর্যয়ের চিত্র পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে শিক্ষা বোর্ডের বিধান ও এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী কঠোর প্রশাসনিক, বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নিতে শিক্ষা বোর্ডে সুপারিশ করা হবে।



