নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস হওয়ার পেছনে কারা দায়ী? মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ারের উপর মিথ্যা অপবাদ চাপিয়ে ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে কেন?

সর্বপ্রথম বাংলা বিজয় ও স্বাধীন করেন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দিন শিরাজের “তবকাত-ই-নাসিরী” গ্রন্থই মুলত মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজি সমন্ধে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বলে সর্বজনীন স্বীকৃত। মিনহাজউদ্দীন সিরাজী বখতিয়ার খলজির  মৃত্যুর প্রায় চল্লিশ বছর পর বাংলায় গিয়ে বাংলা বিজয়ের  ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেন। এবং এই গ্রন্থে বখতিয়ারের অভিযানের ঘটনাগুলো রয়েছে।
ইতিহাসের একটি বিতর্কিত দাবি,
  বখতিয়ার খলজির উপর দায় চাপানো হয় যে
১১৯৩ সালে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়  ধ্বংস করেন।  সেখানে থাকা সকল ছাত্রকেও তখন হত্যা করে এবং সেখানে থাকা বইগুলো পুড়িয়ে  দেয় বখতিয়ার খলজির সৈন্যরা। এই দাবির যারা করেন তারা এর কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ আজ পর্যন্ত উপস্থাপন করেননি। বখতিয়ার খলজির মৃত্যুর প্রায় ৮০০ বছর পর আনুমানিকভাবে এমন অভিযোগ করা হয় তার বিরুদ্ধে।
তবে বেশিরভাগ  ইতিহাসবিদ ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষক ঘটনাটির সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেন এবং এই দাবিকে ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। তাদের মন্তব্য হলো, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বেশ কয়েকবার আক্রমনের স্বীকার হয়েছে ।
প্রথমে  আক্রমন হয়,
পঞ্চম শতাব্দীতে স্কন্দগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খ্রি.) চরমবৌদ্ধ বিরোধী হিন্দু রাজা মিহিরাকুলের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়  আক্রমন করে সেখানকার ছাত্র শিক্ষক ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপর গণহত্যা চালায় সংঘ হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এরপর স্কন্দগুপ্ত ও তার স্থলাভিষিক্ত সম্রাটদের হাতে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধদের থেকে ছিনিয়ে নেওয়া ও  সংস্কার করার উদ্যোগ নেয় এবং সেটি পুরোপুরি সফল হয় নি।
দ্বিতীয় বার আক্রমণ হয়,
 রাজা শশাঙ্ক মগধে প্রবেশ করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেন। তখন তিনি বৌদ্ধদের পবিত্র স্থানগুলিতেও আক্রমণ করেন। শশাঙ্কের আক্রমনের বিবরণ পাওয়া যায় চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙয়ের (৬০২-৬৬৪) সফরনামায়।
সোমপুর মহা বিহার আক্রমণ,
 রাজা জাতবর্মা সোমপুর মহাবিহার আক্রমণ করে ধ্বংস করে এবং সেখানে গণহত্যা চালায়। সোমপুর বিহারের মঠাধ্যক্ষ্য করুণাশ্রী মিত্রকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন। ভোজবর্মার বেলাবলিপিতে এর বিবরণ পাওয়া যায়।
মুসলিম সেনাপতি বখতিয়ারের উপর মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয় ২০১৪ সালে ভারতের  রাজ্যসভায়।  কংগ্রেস সদস্য করণ সিং ও সিপিএম সদস্য সীতারাম ইয়েচুরির মধ্যে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়। করণ সিং দাবি করেন, বখতিয়ার খিলজির হাতে নালন্দা ধ্বংস হয়। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে জানা যায় যায় যে, ১১০০ সালে বখতিয়ার আক্রমণ করেন।
উলসলি হেগের মতে,
 বখতিয়ার ওদন্তপুরী আক্রমণ করেন ১১৯৩ সালে এবং যদুনাথ সরকারের (১৮৭০-১৯৫৮) মতে, ১১৯৯ সালে। কিন্তু সমস্ত ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায় যে, বখতিয়ার ১২০৪ সালের ১০ মে বাংলায় আগমন করেন। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, নালন্দা ১১৯৩ সালে ধ্বংস হয়। কিন্তু তখনো খিলজি বাংলায় আগমন করেননি। এছাড়াও ইতিহাসবিদ মিনহাজ উদ্দীন জুযানির তবাকাত-ই-নাসিরিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বখতিয়ারের কিছু সৈন্য ভুলক্রমে ওদন্তপুরীর মঠে আক্রমণ করে। মিনহাজের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০ সৈন্য নিয়ে বখতিয়ার বিহার দুর্গ আক্রমণ করেন এবং ওদন্তপুরীকে শত্রুদের সেনাশিবির মনে করেন। মূলত বিহারটি সেনাশিবিরের মতোই ছিল। এর চার দিকে বেষ্টনী প্রাচীরও ছিলো। তিব্বতি ঐতিহাসিক লামা তারানাথ (১৫৭৫-১৬৩৪) লেখেন, সেন আমলে তুর্কি অভিযানের ভয়ে বৌদ্ধবিহারগুলোতে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হতো। তবকাতের অনুবাদক আবুল কালাম যাকারিয়ার (১৯১৮-২০১৬) মতে, লড়াই সম্ভবত একপক্ষীয় ছিল না; এখানে প্রচণ্ড প্রতিরোধ হয় এমন সম্ভাবনাও রয়েছে। রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও (১৮৮৫-১৯৩০) বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সেনাদের যৌথ প্রতিরোধের বিবরণ উল্লেখ করেন। এছাড়া বিহারের রাজা গোবিন্দপাল নিজের সৈন্যদের নিয়ে বিহারে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে বিহার জয়ের জন্য খলজি এখানেও আক্রমণ করেন। তখন সৈন্যদের পাশাপাশি বৌদ্ধভিক্ষুরাও অস্ত্র ধারণ করেন। যুদ্ধে তারা পরাজিত হন এবং গোবিন্দ পাল নিহত হন। কোনো কোনো গবেষক দাবি করেন যে, সেন রাজাদের গুপ্তচররা তুর্কি বাহিনীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ওদন্তপুরী বিহারে আক্রমণ করতে প্ররোচিত করে।
ইতিহাসবিদ  দীনেশচন্দ্র সরকার (১৯০৭-১৯৮৪) দাবি করেন যে, ওদন্তপুরী ১১৯৩ সালে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, যা বখতিয়ারের আগমনের পূর্বের ঘটনা ছিল।
ইতিহাস বিশ্লেষণ করে বেশ কয়েকজন গবেষক বলেছে,
  “বাংলার ইতিহাস “গ্রন্থে সুখময় মুখোপাধ্যায় (মৃ. ২০০০ খ্রি.), “বাংলার ইতিহাস সুলতানি আমল” গ্রন্থে গবেষক আবদুল করিম (১৮৭১-১৯৫৩), “বাংলাদেশের ইতিহাস” গ্রন্থে রমেশচন্দ্র মজুমদার উল্লেখ করেন যে, তবকাতে-ই- নাসিরী গ্রন্থে নালন্দা  বিশ্ববিদ্যালয় অভিযানের কোনো বিবরণ নেই। যেটা আক্রমণের কথা বলা হয়েছে এই গ্রন্থ তার সময় ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় সেটি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না।  এবং  বখতিয়ার নালন্দা আক্রমণ করেননি।
তবকাতে -ই- নাসিরী গ্রন্থের  পরের ইতিহাসগ্রন্থ ফুতুহ-উস-সালাতিন ও তাজ-উল-মাসিরেও নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় অভিযানের কোনো উল্লেখ নেই। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (১৮৮০-১৯৬১) তার বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংসের জন্য ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দায়ী করেন এবং বুদ্ধপ্রকাশ (জন্ম ১৯২৪) তার ‘আসপেক্টস অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন’ গ্রন্থে এমন মতামতের পক্ষে জোরালো বয়ান হাজির করেন।
মুলত মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির উপর মিথ্যা দায় চাপানো হয় যে তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আক্রমণ করেছেন এবং সেখানকার সব ধ্বংস করেছেন। তার সময়ে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় পুরোপুরি ধ্বংসের কাছাকাছি ছিল হিন্দু রাজাদের বেশ কয়েকবার আক্রমণের কারণে। হিন্দু রাজারা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধদের থেকে হস্তগত করার উদ্দেশ্যই নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বার বার আক্রমণ করেছে। বখতিয়ারের উপর দায় চাপানোর কারণ হলো তার অর্জনগুলোকে বিতর্কিত করা। এবং মুসলিম সেনাপতিদের শিক্ষা ধ্বংসের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করা।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top