পাইকগাছা ভূমি অফিস ঘিরে ঘুষ লেনদেন ও দালালচক্রের অভিযোগ

খুলনার পাইকগাছা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়কে ঘিরে ঘুষ লেনদেন ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি খাস ও ভিপি জমি বন্দোবস্ত, ইজারা নবায়ন, ডিসিআরসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়ার কথা বলে অফিসের কিছু কর্মচারী ও তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী।

অভিযোগকারীদের দাবি, টাকা দেওয়ার পরও অনেকের কাজ সম্পন্ন হয়নি। এমনকি কেউ কেউ টাকা ফেরতও পাননি। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেও প্রত্যাশিত প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি পাইকগাছা ভূমি অফিসের সার্টিফিকেট সহকারী অমৃত কুমারের বিরুদ্ধে ডিসিআর করে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, টাকা নেওয়ার পরও অনেকের ডিসিআর দেওয়া হয়নি।

এ নিয়ে ভূমি অফিসের সামনে কয়েকজনের সঙ্গে অমৃত কুমারের বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে। তাকে হেনস্তা করা হয়েছে—এমন অভিযোগও ওঠে। তবে ভুক্তভোগী আজু মোল্লা বলেন, “অমৃত কুমার আমার কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নিয়েছেন। ওই টাকা ফেরত বা ডিসিআর দিতে অস্বীকার করায় তার সঙ্গে আমার বাকবিতণ্ডা হয়েছে। তবে তাকে লাঞ্ছিত করার বিষয়টি ঠিক নয়।”

অন্যদিকে শামছুজ্জামান, আবুল হোসেন ও জয়ত্রী সাধুসহ কয়েকজনের অভিযোগ, ডিসিআর করে দেওয়ার কথা বলে তাদের কাছ থেকেও বিভিন্ন সময়ে টাকা নেওয়া হয়েছে। তারা অভিযোগগুলোর তদন্ত করে টাকা ফেরত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

খাস ও ভিপি জমি বন্দোবস্ত নিয়েও অভিযোগ

শুধু ডিসিআর নয়, সরকারি ভিপি ও খাস জমি বন্দোবস্ত করে দেওয়ার নামেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, কথিত দালালদের মাধ্যমে ভূমিহীনদের সরকারি জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। কেউ কেউ টাকা দেওয়ার পরও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন।

সম্প্রতি সোলাদানা ইউনিয়নের ভিলেজ পাইকগাছা, পারিশামারি, কাঠামারি, কাঁকড়াবুনিয়া ও দক্ষিণ কাঠামারি মৌজার দীর্ঘদিনের বন্দোবস্ত গ্রহীতাদের জমিতে ‘সরকারি ভিপি সম্পত্তি’ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। এতে প্রায় শতাধিক ভূমিহীন পরিবার উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

তাদের দাবি, ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী তারা প্রায় ২০০ একর খাস জমি বন্দোবস্ত পেয়েছেন। অনেকের নামজারি ও রেকর্ড রয়েছে এবং তারা নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন করও পরিশোধ করছেন। বিষয়টি যাচাই ও প্রতিকারের দাবিতে ৫৯ জন বন্দোবস্ত গ্রহীতা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।

আদালতে মামলার তথ্য

পাইকগাছা ভূমি অফিসে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি প্রতাপকাটী গ্রামের নজরুল ইসলাম শেখ তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীমসহ ভূমি অফিসের পাঁচজনের বিরুদ্ধে পাইকগাছা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন। মামলাটি সিআর ৩৬/২৫ নম্বরে নথিভুক্ত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জানিয়েছেন।

মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট এফএমএ রাজ্জাক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তার দাবি, কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় অভিযুক্ত কয়েকজন দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকায় ঘুষ-দুর্নীতির অভিযোগ বেড়েছে।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতাপকাটী মৌজার ৫৫৪/৭৪-৭৫ নম্বর ভিপি লিজ কেসের ইজারা নবায়নের কথা বলে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে মোট ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। মামলায় সার্টিফিকেট সহকারী অমত্য বিশ্বাস, সার্ভেয়ার কাওছার আলী, নাজির মো. জিহাদ উল্ল্যাহ এবং কপিলমুনি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা কামাল হোসেনকেও আসামি করা হয়।

বাদীর অভিযোগ ছিল, টাকা নেওয়ার পরও তাকে ইজারা না দিয়ে অন্য পক্ষকে ইজারা দেওয়া হয়। এ নিয়ে সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশিত হয়।

সরকারি সম্পত্তি নিয়ে অভিযান

এর আগে সরকারি সম্পত্তি সুরক্ষা ও অবৈধ দখলমুক্ত করতে পাইকগাছার বিভিন্ন এলাকায় খাস ও ভিপি জমি পরিদর্শন করা হয়। পুটিমারী, পানা ও তেতুলতলা এলাকায় জমির সীমানা নির্ধারণ, সাইনবোর্ড স্থাপন এবং অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

বর্তমানে পাইকগাছার সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. ফজলে রাব্বী। ডিসিআর নিয়ে বিরোধের বিষয়ে তিনি বলেন, “যারা অমৃতকে ঘুষ দিয়েছেন, তাদের দায়িত্বে বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন।”

দালালমুক্ত ভূমিসেবার দাবি

স্থানীয় সচেতন মহলের অভিযোগ, ভূমি অফিসের সামনে ও আশপাশের কিছু কম্পিউটার দোকান এবং কথিত ভূমিসেবা কেন্দ্রকে ঘিরে দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। সাধারণ মানুষ ভূমিসেবার সরকারি ফি ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা না থাকায় এসব ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এর সুযোগে সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।

স্থানীয়দের দাবি, শুধু ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী নয়, অফিসের বাইরে সক্রিয় কথিত দালাল ও সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার দোকানগুলোর কার্যক্রমও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে ভিপি ও খাস জমি বন্দোবস্ত, ডিসিআর, ইজারা নবায়নসহ বিভিন্ন ভূমিসেবায় অর্থ লেনদেনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের আরও দাবি, ভূমিসেবার নির্ধারিত ফি প্রকাশ্যে টাঙানো, দালালদের প্রভাব বন্ধ করা এবং সাধারণ মানুষকে সরাসরি সরকারি সেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হোক।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

Scroll to Top