ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট বুকিং করতে গিয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন বাংলাদেশি আবেদনকারীরা। একই অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য দুই থেকে তিনবার পেমেন্ট করার পরও স্লট নিশ্চিত না হওয়ার অভিযোগ করেছেন একাধিক আবেদনকারী। পাশাপাশি আবেদনপত্রের Webfile আপলোড, সার্ভার ও পেমেন্ট প্রক্রিয়ায় নানা সমস্যার কথা জানিয়েছেন তাঁরা।
আজ বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কেটে নেওয়া হলেও ইনভয়েস পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার জন্য তাঁরা প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার চেষ্টা করেন। কিন্তু শুরু থেকেই বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সমস্যার মুখে পড়েন। কেউ Webfile আপলোড করতে পারেননি, কেউ পেমেন্টের ধাপে গিয়ে আটকে গেছেন। আবার অনেকের পেমেন্ট সফল হওয়ার পরও অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইনভয়েস তৈরি হয়নি।
সবচেয়ে বেশি অভিযোগ উঠেছে পেমেন্ট নিয়ে। আবেদনকারীদের ভাষ্য, পেমেন্টের টাকা কেটে নেওয়ার পরও অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে অনেকে পুনরায় পেমেন্ট করার চেষ্টা করেছেন। দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয়বারও টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। অথচ তাঁদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত হয়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকেও একই ধরনের সমস্যার কথা জানাচ্ছেন ভিসাপ্রত্যাশীরা। বিশেষ করে পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পর ইনভয়েস না পাওয়া এবং আবেদন প্রক্রিয়া আটকে যাওয়ার অভিযোগ সামনে আসছে। তবে বৃহস্পতিবার মোট কতজন আবেদনকারী এই সমস্যায় পড়েছেন, তার কোনো নিশ্চিত পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।
আবেদনকারীদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, পেমেন্টের টাকা কেটে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ইমেইল বা অন্য মাধ্যমে যোগাযোগ করে অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা করার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু টাকা ফেরতের সুযোগ থাকলেও আবেদনকারীদের ভোগান্তি কমছে না। একটি অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে গিয়ে বারবার পেমেন্ট করা, পরে সেই টাকা ফেরতের জন্য যোগাযোগ করা এবং শেষ পর্যন্ত অ্যাপয়েন্টমেন্ট না পাওয়া নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
প্রশ্ন উঠেছে, পেমেন্ট সম্পন্ন হওয়ার পরও কেন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ইনভয়েস তৈরি হচ্ছে না? একই আবেদন নম্বরের বিপরীতে একাধিকবার টাকা কেটে নেওয়ার সুযোগ কেন থাকছে? একটি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই করার ব্যবস্থা কেন কার্যকরভাবে কাজ করছে না?
গত ৬ অক্টোবর ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (IVAC) অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুকিং নিয়ে নতুন নির্দেশনা প্রকাশ করে। এতে পরবর্তী দুই সপ্তাহের অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট সাধারণত বৃহস্পতিবার অথবা সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে প্রকাশের কথা জানানো হয়। স্লটের প্রাপ্যতা অনুযায়ী রোববার থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত বুকিংয়ের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা প্রকাশের মাত্র দুই দিনের মাথায় বৃহস্পতিবারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট কার্যক্রমে এমন অভিযোগ সামনে আসায় ভিসা ব্যবস্থাপনার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ভারত বিশ্বের অন্যতম বড় তথ্যপ্রযুক্তি সেবাদানকারী দেশ। সফটওয়্যার উন্নয়ন, ডিজিটাল পেমেন্ট ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোয় দেশটির দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। অথচ বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য পরিচালিত ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থায় পেমেন্ট, ফাইল আপলোড এবং ইনভয়েস তৈরির মতো মৌলিক কার্যক্রম নিয়েই বারবার অভিযোগ উঠছে।ভারতের মতো একটি দেশের হাইকমিশনের অধীনে পরিচালিত ভিসা সেবায় এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। বিশেষ করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়ার চেষ্টা করবেন, সেটি কর্তৃপক্ষের আগে থেকেই জানা থাকার কথা। সেই চাপ সামলানোর মতো সার্ভার ও পেমেন্ট ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
বাংলাদেশি আবেদনকারীদের জন্য ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা, পারিবারিক প্রয়োজন এবং জরুরি ভ্রমণের জন্য অনেকে এই অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষায় থাকেন। নির্ধারিত দিনে স্লট বুকিং করতে না পারলে তাঁদের ভ্রমণ পরিকল্পনা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। চিকিৎসার জন্য অপেক্ষায় থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে এই বিলম্ব আরও গুরুতর সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ থাকলেও স্থায়ী সমাধান এখনো দৃশ্যমান নয়। বিভিন্ন সময়ে বুকিং পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হলেও আবেদনকারীদের জন্য নির্ভরযোগ্য ও হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে।
এ অবস্থায় ভারতীয় হাইকমিশন ও IVAC কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। বৃহস্পতিবার যেসব আবেদনকারীর টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে, তাঁদের লেনদেনের তথ্য যাচাই করে দ্রুত সমাধান দিতে হবে। পেমেন্ট সফল হলেও যাঁরা ইনভয়েস পাননি, তাঁদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত করার সুযোগ দিতে হবে। সেটি সম্ভব না হলে অতিরিক্ত বা ব্যর্থ পেমেন্টের অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে।
একই আবেদন নম্বরের বিপরীতে একাধিক পেমেন্ট গ্রহণ বন্ধ করাও জরুরি। পেমেন্টের পর সার্ভারে সমস্যা দেখা দিলে আবেদনকারী যেন Transaction ID ব্যবহার করে নিজের লেনদেনের অবস্থা জানতে পারেন, সেই ব্যবস্থা থাকতে হবে। এ ছাড়া Webfile আপলোড ও অ্যাপয়েন্টমেন্ট সার্ভারের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে অতিরিক্ত ব্যবহারকারীর চাপেও সেবা বন্ধ না হয়।
প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে যাঁরা নির্ধারিত সময়ে আবেদন সম্পন্ন করতে পারেননি, তাঁদের জন্য বিকল্প সময় বা বিশেষ সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর সাপোর্ট ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যেখানে আবেদনকারীরা দ্রুত সমস্যার সমাধান পাবেন।
ভারতীয় হাইকমিশনের উচিত বৃহস্পতিবারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট কার্যক্রমের পেমেন্ট ও সার্ভার সংক্রান্ত অভিযোগ তদন্ত করে প্রকৃত পরিস্থিতি প্রকাশ করা। কতটি পেমেন্ট সফল হয়েছে, কতজন ইনভয়েস পাননি এবং কতটি লেনদেনের বিপরীতে অর্থ ফেরত দিতে হবে, সেই হিসাব আবেদনকারীদের সামনে আসা প্রয়োজন।
একটি ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে গিয়ে একজন বাংলাদেশি নাগরিককে বারবার টাকা দিতে হবে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সার্ভারের সঙ্গে লড়তে হবে, এরপর নিজের টাকা ফেরত পেতেও ইমেইল করতে হবে, এমন ব্যবস্থা চলতে পারে না।
ভারতীয় হাইকমিশন ও IVAC কর্তৃপক্ষের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, বাংলাদেশি ভিসাপ্রত্যাশীদের এই ভোগান্তি বন্ধ করতে তারা কার্যকর ব্যবস্থা কবে নেবে?



