মান্দায় এতিমখানার জমি দখলের অভিযোগ: পুকুর খনন, এসটিডব্লিউ স্থাপন, কোটি টাকার সম্পত্তি হাতছাড়া হওয়ার শঙ্কা

নওগাঁর মান্দা উপজেলার দক্ষিণ শ্রীরামপুর আইজান বেওয়া নূরানী হাফেজিয়া লিল্লাহ বোর্ডিং মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রায় সাড়ে তিন বিঘা জমি দখল, ধানি জমি কেটে অবৈধভাবে পুকুর খনন, এসটিডব্লিউ (শ্যালো টিউবওয়েল) স্থাপন এবং কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাতের অভিযোগে নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহল ও সাবেক পরিচালনা কমিটির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন এবং আদালতে একাধিক মামলা হলেও দীর্ঘদিনেও কার্যকর প্রতিকার মেলেনি বলে দাবি করেছে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাদ্রাসার নামে থাকা ধানি জমির বড় একটি অংশ ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে কেটে বিশাল পুকুরে রূপান্তর করা হয়েছে। আরেকটি জমিতে স্থাপন করা হয়েছে একটি গভীর নলকূপ (এসটিডব্লিউ), যা বর্তমানে দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এ ঘটনায় মাদ্রাসার শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
মাদ্রাসা সূত্র জানায়, ১৯৭৮ সালে এলাকার দুই দানশীল নারী আয়জান বেওয়া ও রহিমন বেওয়া গোবিন্দপুর মৌজার হাল ৪০১ নম্বর খতিয়ানের অধীনে সাড়ে তিন বিঘা জমি মাদ্রাসার নামে দানপত্রের মাধ্যমে হস্তান্তর করেন। গত ৪৫ বছর ধরে ওই জমি চাষাবাদ করে তার আয় থেকে এতিম ও লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের ভরণপোষণ এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যয় নির্বাহ করা হতো।
তবে ২০২১ সালে তৎকালীন পরিচালনা কমিটির প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ বছরে ৭০ হাজার টাকায় জমিটি লিজ নেন। অভিযোগ রয়েছে, পরে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আলহাজ জাহাঙ্গীর আলম প্রভাব খাটিয়ে লিজের মূল কাগজপত্র নিজের কাছে নিয়ে নেন এবং মাদ্রাসা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই জমিটি স্থানীয় ইটভাটা মালিক নাজমুল হক মিলনের কাছে হস্তান্তর করেন।
অভিযোগ আরও রয়েছে, নাজমুল হক মিলন ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে প্রকৃত তথ্য গোপন করে জমিটি নিজের নামে নামজারি (খারিজ) করে নেন। পরবর্তীতে তিনি মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জমিটি এক যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসীর কাছে বিক্রি করে দেন। ২০২৪ সালের মে মাসে ওই প্রবাসীর ভাড়াটে লোকজন জমির পাকা ধান কাটতে গেলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং সংঘর্ষ এড়াতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। এ ঘটনায় আদালতে মামলা দায়ের করেন আব্দুল মালেক আকন্দ।
পরে নবগঠিত পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে খারিজ বাতিলের আবেদন করেন। শুনানিতে বিবাদীপক্ষ উপস্থিত না থাকায় তৎকালীন এসিল্যান্ড একতরফা আদেশ দিয়ে বিষয়টি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। তবে তদন্ত কার্যক্রম এখনও সম্পন্ন হয়নি।
বর্তমান কমিটির দাবি, এ সুযোগে দখলদার চক্র জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে ফেলেছে। ৪০১ নম্বর খতিয়ানের ১৩৪৪ নম্বর দাগের ধানি জমি কেটে পুকুর খনন করা হয়েছে এবং ৪০২ নম্বর খতিয়ানের ১২৯৩ নম্বর দাগে এসটিডব্লিউ স্থাপন করা হয়েছে। এতে জমির প্রকৃত অবস্থা পরিবর্তিত হওয়ায় ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।

এদিকে জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একের পর এক মামলা-মোকদ্দমার কারণে মাদ্রাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রতিপক্ষ আলতাফ হোসেন বিভিন্ন সময় পরস্পরবিরোধী দাবি তুলে হয়রানিমূলক মামলা করেছেন। কখনও তিনি জমি ক্রয়সূত্রে নিজের বলে দাবি করছেন, আবার অন্য মামলায় ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত বলে উল্লেখ করেছেন। সম্প্রতি আদালত একটি মামলা খারিজ করে দিলেও পরবর্তীতে গাছ কাটার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মাদ্রাসা কমিটির সদস্যদের বিরুদ্ধে আরেকটি জিআর মামলা দায়ের করা হয়েছে, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম সুজা ও প্রচার সম্পাদক আব্দুল মালেক আকন্দ বলেন, “এটি আল্লাহর ঘর ও এতিম শিশুদের সম্পত্তি। আমরা আইনের আশ্রয় নিয়েছি, কিন্তু কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছি না। চলতি মৌসুমে জমিতে ধান তুলতে গেলেও প্রতিপক্ষের লোকজন আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে।”
অভিযুক্ত ইটভাটা ব্যবসায়ী নাজমুল হক মিলনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তবে আলতাফ হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “উল্লেখিত দাগে মাদ্রাসার কোনো জমি আছে কিনা তা আমাদের জানা নেই। বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারলে আমরা জমি ছেড়ে দেব।”
মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি রাশেদ ইকবাল বলেন, “বিগত কমিটির সময়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে এই সম্পত্তি হস্তান্তরের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে আদালতে একাধিক মামলা চলমান রয়েছে। আমরা এতিমখানার জমি উদ্ধার এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা চাই।”
মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খোরশেদ আলম বলেন, “লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এলাকাবাসীর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই বিরোধে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ না হলে মাদ্রাসা ও এতিমখানার অবশিষ্ট সম্পত্তিও দখল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তারা ভূমি প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

মন্তব্য করুন

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

বানারীপাড়ায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও আইসিটি অধিদপ্তরের সহায়তায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ইন্টারনেট বিলের ১০ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

বরিশালের বানারীপাড়ায় প্রতারনার মাধ্যমে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ও উপজেলা