মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে দিশা-দীপকে

বিমান বাহিনীর বরখাস্ত ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য ক্রমেই জটিল হচ্ছে। পুলিশ ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করেছে তার বান্ধবী জেরিকা তাসনিম দিশাকে। আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে। এর আগেই গ্রেপ্তার হওয়া বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ এবং দিশা দুজনই এখন তদন্তের কেন্দ্রে রিমান্ডে রয়েছেন।

উত্তরার নেস্ট রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড বার থেকে টঙ্গীর হাজী মাজার বস্তি পর্যন্ত তাদের গতিবিধি, সিসিটিভি ফুটেজ, টহল পুলিশের বক্তব্য এবং মোবাইল ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করছেন তদন্তকারীরা। বিশেষ করে নিখোঁজ হওয়ার রাতের কয়েক ঘণ্টার ঘটনা নিয়ে তৈরি হয়েছে একাধিক প্রশ্ন।

দীপের দেওয়া প্রাথমিক বর্ণনার সঙ্গে বিভিন্ন তথ্যের অসংগতি পাওয়ায় রিমান্ডে তার কাছ থেকে তথ্য পেতে চায় তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। অন্যদিকে, দিশার কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করছে তদন্ত সংস্থা।

আত্মগোপনে থাকা দিশাকে গত শনিবার রাতে রাজধানীর কাফরুলের একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে উত্তরখান থানায় করা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

গতকাল রোববার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাকে হাজির করে সাত দিনের রিমান্ড চান মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। শুনানি শেষে মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এর আগে গত গ্রেপ্তার দীপেরও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে আদালত।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, তদন্তে দিশা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কয়েকটি কারণে। ২৭ অক্টোবর রাতে তাহসিফের সঙ্গে তাকে উত্তরার বারে দেখা গেছে। এছাড়া সন্ধ্যায় উত্তরার সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকসেও তাহসিফের সঙ্গে একাধিকবার যাতায়াতের তথ্য পেয়েছেন তদন্তকারীরা।

একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজেও তাদের উপস্থিতির তথ্য মিলেছে। এছাড়া তাহসিফের মোবাইল ফোনের কললিস্টেও দিশার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেছে পুলিশ।

তদন্তকারীরা জানতে চান, ঘটনার দিন সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত তাহসিফের সঙ্গে দিশার কী ধরনের যোগাযোগ হয়েছিল, তারা কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন এবং পরে কীভাবে আলাদা হন। দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তাহসিফ ও দীপের মধ্যে কী ঘটেছিল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষ করে, দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। দুজনের বর্ণনায় কোনো অসংগতি থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান করবেন তদন্তকারীরা। এছাড়া হত্যাকাণ্ডের স্থান, অন্য কারো সংশ্লিষ্টতা এবং সম্ভাব্য আলামতের বিষয়ে তথ্য পাওয়ার আশাও করছেন তারা।

নৌ পুলিশের মিডিয়া শাখার পুলিশ সুপার মাসুমা আক্তার জানান, রোববার দিশার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। এর আগে শনিবার দীপেরও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাপ্ত তথ্যের আলোকে মামলার পরবর্তী তদন্ত কার্যক্রম চলবে।

দীপের বর্ণনায় যে প্রশ্নগুলো

দীপ পিবিআইয়ের কাছে প্রাথমিকভাবে হেফাজতে থাকা অবস্থায় দাবি করেন, টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় অবস্থানের সময় পুলিশের পোশাক পরা দুই ব্যক্তিকে দেখে তারা দুজন দুই দিকে দৌড়ে পালান। একপর্যায়ে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। আর দীপ অন্যদিকে পালিয়ে যান।

তবে তার এই বর্ণনা তদন্তকারীদের কাছে এখনো পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য হয়নি। কারণ, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, টহল পুলিশের বক্তব্য এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে দীপের বর্ণনার কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, দীপ যে দুই ব্যক্তিকে পুলিশ সদস্য বলে দাবি করছেন, তারা আসলে কারা। ওই রাতে টঙ্গী পশ্চিম থানা পুলিশের টহল দলের সদস্যদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাজার বস্তি এলাকায় দীপের সঙ্গে তাদের দেখা হয়েছিল। তার পোশাক ও জুতায় কাদা-ময়লা ছিল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দীপ নিজেকে সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরিচয় দেন। পরে টহল দলের সদস্যরা তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন।

কিন্তু এই সাক্ষাতের আগে কী ঘটেছিল, সেটিই এখন তদন্তের বড় বিষয়। দীপের পোশাকে কাদা ও ময়লা পানি লাগার কারণ কী? তাহসিফের সঙ্গে তার বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনা কীভাবে ঘটেছিল? তারা কি সত্যিই পুলিশের ধাওয়া খেয়েছিলেন, নাকি অন্য কোনো ঘটনা আড়াল করতে এমন বর্ণনা দিয়েছেন? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা। বারের সিসিটিভিতে তিনজন

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, উত্তরার বারের সিসিটিভি ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে সামনে এসেছে। তা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত মঙ্গলবার রাত ১০টা ১৭ মিনিটের দিকে তাহসিফ এক তরুণীকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে প্রবেশ করেন। পরে পৃথক মোটরসাইকেলে সেখানে যান দীপ। একপর্যায়ে তিনজনকে একসঙ্গে লিফটে উঠতে দেখা যায়।

রাত ১১টা ৫১ মিনিটের দিকে তাদের বেরিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান করেছিলেন তারা। ওই তরুণীই হলেন দিশা।

এছাড়া সন্ধ্যায় সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস এবং একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে তাদের যাতায়াতের তথ্যও তদন্তে এসেছে। এসব স্থানের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন, কার সঙ্গে দেখা করেছিলেন এবং কোন সময় কোন স্থানে ছিলেন, তার ধারাবাহিক চিত্র তৈরির চেষ্টা চলছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের কাছে রাত ১১টা ৫১ মিনিটের পরের সময়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এরপরই তাহসিফ ও দীপের গতিবিধি নিয়ে তৈরি হয়েছে সবচেয়ে বড় রহস্য। তরুণীকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার পর তারা টঙ্গীর দিকে যান বলে তদন্তে জানা গেছে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর কী ঘটেছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এদিকে, তদন্তে নতুন মাত্রা যোগ করেছে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল। গত শুক্রবার সকালে তুরাগ নদ থেকে প্রায় ৫০ গজ দূরে একটি সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়। পিবিআই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়েছে, সেটি তাহসিফের। ফরেনসিক পরীক্ষায় মোবাইল

তদন্তকারীরা তাহসিফ, দীপ এবং দিশার মোবাইল ফোনের কললিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। ঘটনার আগের ও পরের যোগাযোগের সময় মিলিয়ে দেখছেন তারা। বিশেষ করে রাতের বিভিন্ন সময়ে দুজনের অবস্থান এবং কথোপকথনের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাহসিফের ফোন থেকে তার মাকে একটি এসএমএস পাঠানোর তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে বাসায় ফেরার কথা বলা হয়েছিল বলে জানা গেছে। একই সময় দীপও তার বাসার দারোয়ানকে ফোন করে ফিরতে দেরি হবে জানিয়ে গেট খোলা রাখার অনুরোধ করেছিলেন।

দুজনের মোবাইল ফোনের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যোগাযোগের প্রকৃত সময়, বার্তার সত্যতা এবং অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে তাহসিফের ফোন থেকে পাঠানো বার্তাটি সত্যিই তার পাঠানো কি না, সেটিও প্রযুক্তিগতভাবে যাচাই করা হচ্ছে। মৃত্যু নিয়ে ধোঁয়াশা

তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার শরীরে বাইরে থেকে দৃশ্যমান বড় ধরনের আঘাতের চিহ্ন ছিল না বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। এ সময় পকেটে থাকা দামি আইফোন ও অন্যান্য জিনিসপত্রও অক্ষত ছিল।

ফলে সাধারণ ছিনতাইয়ের ঘটনা হিসেবে বিষয়টি দেখছেন না তদন্তকারীরা। এছাড়া শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে কি না, নাকি পানিতে ডুবে তার মৃত্যু হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে।

তবে ময়নাতদন্ত ও রাসায়নিক পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন ছাড়া মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। শরীর থেকে সংগ্রহ করা নমুনার পরীক্ষার ফল এবং অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করা হলে এ বিষয়ে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে একাধিক ব্যক্তি জড়িত কি না, কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত মঙ্গলবার উত্তরার রাজউক কপ্লেক্সের বাসা থেকে বের হন বিমান তাহসিফ। পরদিন বিকেলে টঙ্গীর তুরাগ নদের রাজবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তার ভাসমান লাশ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ।

মন্তব্য করুন

জনপ্রিয় খবর

এ সম্পর্কিত আরো পড়ুন

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল চাকরিমুখী শিক্ষা প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠতে হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

বিশ্ববিদ্যালয় কেবল চাকরিমুখী শিক্ষা প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং গবেষণাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

Scroll to Top